ভারতের গর্ব

স্যার আইজ্যাক নিউটনকে তো আমরা সবাই চিনি। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে তিনি পদার্থবিদ্যায় অভিকর্ষ ও মহাকর্ষ সম্পর্কিত তত্ত্ব এবং গণিতে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করে বিজ্ঞানকে এক অবিশ্বাস্য গতি প্রদান করেছিলেন। আর সেইজন্য তিনি আজও সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছেন। কিন্তু অনেকেই জানে না যে, তার এই কৃতিত্বের প্রায় পুরোটাই প্রাপ্য ভারতীয় দার্শনিক গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদগনের।

প্রচলিত আছে, একদিন বিকেলে বাগানে বসে থাকার সময় গাছ থেকে একটা আপেল পড়তে দেখে তিনি ভাবনা-চিন্তা শুরু করেন, যার ফলশ্রুতি হলো অভিকর্ষ ও মহাকর্ষ সম্পর্কিত তত্ত্ব ও সূত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিশয় এই যে এই জনশ্রুতি সর্বৈব মিথ্যা। আসলে, তার হাতে এসে পড়েছিল দ্বাদশ শতাব্দির হিন্দু জোতির্বিদ- দার্শনিক দ্বিতীয় ভাস্করাচার্্যে্র একটি গ্রন্থ –‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’ । এই গ্রন্থে তিনি অভিকর্ষ মহাকর্ষ ও ক্যআলকুলাসের আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থের একটি শ্লোকে আছে—
“ আকৃষ্টি শক্তিশ্চ মহীতয়া যৎ
খসৃং গুরু স্বাভিমুখং স্বশক্ত্যা
আকৃষ্যতে তৎ পততীবভাতি
সমে সমস্তাৎ ক্ক পতত্বিয়ং খে !!”
অর্থাৎ, আকর্ষণ শক্তি সম্পন্ন পৃথিবী যখন উপরিস্থিত জড়বস্তুকে আপন শক্তির সাহায্যে নিজের দিকে আকর্ষন করে তখন মনে হয় যে এই সব বস্তু ভুপতিত হচ্ছে। বিভিন্নমুখী শক্তির বলে মহাকাশে পৃথিবীর অবস্থান সুনির্দিষ্ট ।
দ্বিতীয় ভাস্করাচার্য তার এই শ্লোকে দুটি কথা স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন –
প্রথমত, পৃথিবীর আকর্ষন-বল আছে এবং সে সমস্ত উপরিস্থিত বস্তুকে নিজের দিকে টানছে বলেই সেই সব আকর্ষিত বস্তু মাটিতে পড়ছে বলে মনে হয়।
দ্বিতীয়ত, ‘বিভিন্নমুখী’ শক্তি বলতে ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন পদার্থের আকর্ষন বলের কথা বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে,ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন পদার্থজাত আকর্ষন শক্তির বলে গ্রহ নক্ষত্রদের অবস্থান মহাকাশে অবিচ্যুত।
আচ্ছা, একে কি দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের কল্পনামাত্র মনে হচ্ছে? পড়ে যাচাই করে নেয়া যেতেই পারে। কেননা ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’, গ্রন্থটি অতিদুর্লভ বস্তু নয় । গ্রন্থটি পড়লেই বোঝা যাবে কতটা উন্নত ছিল সেই সময়কার গণিত। বইটির প্রথম খণ্ডের নাম লীলাবতি। বইটি এখন আধুনিক গনিতজ্ঞদের গবেষণার বস্তু। এখানে তিনি বহুবার ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস এবং ডিফাররেনশিয়াল ক্যালকুলাসের সুনিপুণ প্রয়োগ করেছেন। তবে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক যে তিনি নন, তাঁর বহু বছর আগের কেউ, সেকথা খুব জোর দিয়েই বলা যায়। কেননা সেই সময় পঞ্চগণিত নামে যে পাঁচ প্রকার গণিত পাঠ্য ছিল তার মধ্যে কলনবিদ্যা (ক্যালকুলাসের প্রাচীন ভারতীয় নাম) ছিল অন্যতম।
মনে হতেই পারে, এটা নিছকই কাকতালীয় যে ক্যালকুলাস প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ভারতে প্রচলিত ছিল। নিউটন পৃথকভাবেই তা আবিষ্কার করেছেন। এই ভ্রান্তি দূর করার জন্য আমি আরো কিছু প্রমাণ দিয়ে বক্তব্যে ইতি টানবো।
মনে আছে, নিউটনের সেই বিখ্যাত উক্তি “আমি যদি সাধারন মানুষের থেকে বেশি কিছু জেনে থাকি, তাহলে তা বিশালাকায়দের কাঁধে ভর দিয়েই” ? সেইরকম বিশালাকায় জ্ঞানী মানুষ পাশ্চাত্যে যে কেউ ছিল না তা তো বলাই বাহুল্য। তবুও তাঁর এই বক্তব্যের অর্থ আমরা তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু ওট্টারবুরি মহাশয়ের লেখা থেকেই বোঝার চেষ্টা করবো। তিনি বলেছেন – “বিনয় আমাদের এই শিক্ষা দেয় প্রাচীন ঋষিদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত থাকতে, বিশেষ করে আমরা যখন তাঁদের কীর্তি সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানি না। নিউটন জানতেন তাঁদেরকে। এবং তাঁদের প্রতিভা, জ্ঞান এবং ক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক অবহিত ছিলেন বলেই তিনি ওইসব প্রাচীন ঋষিদের শ্রদ্ধা করতেন ভগবানের মতো। কারন তাঁদের জ্ঞানের আকর যেসব গ্রন্থ নিউটন সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, সেগুলো অধ্যয়ন করে তিনি এই কথাটাই বুঝেছিলেন যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের আবিষ্কার ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের চেয়ে চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর। প্রাচীন জ্ঞানের আকর গ্রন্থগুলোর সিকিভাগের অর্ধেকও আমাদের কাছে রক্ষিত নেই। থাকলে আমাদের নিত্যনতুন আবিষ্কার সব তাঁদের কাছে ম্লান হয়ে যেত।”

তথ্যসূত্র :
১) ভারতীয় দর্শনে আধুনিক বিজ্ঞান (প্রশান্ত প্রামাণিক)
২) ডাইনোসররাও কি জুতো পরতো? (পরমেশ চৌধুরি)
৩) আন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য

ফেব্রুয়ারী ২৫th, ২০১৫ by