এক বিস্মৃতপ্রায় বাঙালী অঙ্কের মাস্টারমশাই কেশব চন্দ্র নাগ

কেশব চন্দ্র নাগ নামটা নিশ্চয়ই শোনা শোনা লাগছে? বর্তমান প্রজন্মের ছেলে -মেয়েরা হয়ত নামটা শোনেই নি তবে আমরা তাঁর অঙ্ক বই থেকে অঙ্ক কষার সুযোগ পেয়েছি | তিনি কত বড় অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন সে কথাটা শুনেছি বহুবার ৷

চৌবাচ্চা দিয়ে জল বেরোচ্ছে আর ঢুকছে ৷ তেলমাখা বাঁশে বাঁদর উঠছে আর নামছে ৷ সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে ৷ প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে গতিময় ট্রেন‚ তাহলে ট্রেনের দৈর্ঘ্য কত হবে ?

স্কুল পেরোনো মধ্যবয়সীদের অফিসে ডেডলাইন চাপের দুঃস্বপ্নেও ফিরে আসে এই প্রশ্নগুলো ৷ কারণ স্কুলস্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে সাদা পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরে পাটীগণিত ৷ নাম তার ‘ কে সি নাগ ‘ ৷

কারও কাছে কে সি নাগ নামটা কে সি দাসের রসগোল্লার মতোই মধুময় ৷ কারও কাছে আবার কে সি পালের ছাতার শক্ত বাঁট ৷ কে সি নাগের অঙ্ক একদিকে শাস্তি ৷ আবার সেই অঙ্কের সমাধান নিজের হাতে কষা যেন অ্যাচিভমেন্ট ৷

তাঁর বই তো অনেক দেখেছি ৷ চলুন না এ বার একটু ব্যক্তি কে সি নাগকে দেখি ৷

স্বামী বিবেকানন্দ যে বছর শিকাগোয় বিশ্বজয় করলেন ‚ সে বছরেই হুগলির গুড়াপের নাগপাড়ায় জন্ম তাঁর ৷ ১৮৯৩-এর ১০ জুলাই ৷ সেদিন ছিল রথযাত্রা ৷ সন্তানের নাম ‘কেশবচন্দ্র‘ রেখেছিলেন বাবা রঘুনাথ ৷ কিন্তু সন্তানের শৈশবেই চলে গেলেন বাবা ৷ ছেলেকে বড় করতে শুরু হল মা ক্ষীরোদাসুন্দরী দেবীর কঠিন লড়াই ৷

গুড়াপে তখন সবেধন নীলমনি একটাই স্কুল ৷ সেখানেই ভর্তি হলেন শিশু কেশব ৷ পরে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন ভস্তারা যোগেশ্বর হাই স্কুলে ৷ ৩ মাইল দূরে সেই স্কুলে যেতে ভোররাত থেকে হাঁটতে শুরু করতেন কেশব ৷ আবার বাড়ি ফিরতেন সূর্য পাটে ডুবলে ৷ নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন কিষেনগঞ্জ হাই স্কুলে ৷

১৯১২ সালে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে কেশব তখন কলকাতার রিপন কলেজের ( আজকের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ) ছাত্র ৷ ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন আইএসসি ৷

এরপর যোগেশ্বর স্কুলে থার্ড মাস্টারি কিছুদিন ৷ সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনি ৷ নইলে স্কুলের সামান্য বেতনে বড় সংসার চালানো অসম্ভব ৷ কিন্তু তার মধ্যেই মনে হল শেষ করতে হবে উচ্চশিক্ষা ৷ বিজ্ঞান শাখায় না করে কেশবচন্দ্র স্নাতক হলেন অঙ্ক সংস্কৃত এবং কলাবিদ্যায় ৷ পেলেন বিএ ডিগ্রি ৷ এরপর কিষেণগঞ্জ স্কুলে গণিতের শিক্ষক ৷ পড়িয়েছিলেন বহরম পুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলেও ৷

তখন তাঁর ধ্যান জ্ঞান শুধুই গণিত ৷ কী করে ছাত্রদের অঙ্কভীতি দূর করা যায় ‚ কী করে গণিতকে আরও প্রাঞ্জল করে তোলা যায়‚ এই ছিল তাঁর স্বপ্ন ৷

তাঁর পড়ানোর খ্যাতি ছাড়িয়ে পড়ল ৷ স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে এলেন কলকাতায় ৷ ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে ৷ সেখান থেকেই প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন ৷

কলকাতায় প্রথমে থাকতেন রসা রোডের মেসে ৷ পরে দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনে বাড়ি করেছিলেন ৷

শিক্ষকতা নিয়েই মগ্ন ছিলেন কেশবচন্দ্র ৷ স্কুলে অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন কবি কালিদাস রায় ৷ তাঁর বাড়িতে বসত সাহিত্যিকদের আড্ডা ৷ মধ্যমণি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ৷ একদিন বৈঠকী মেজাজেই কথা সাহিত্যিক প্রস্তাব দিলেন বরং বই লিখুন কেশবচন্দ্র ৷ কিছুদিন পরে জোর করে বললেন কালিদাস রায় | যে কেশবচন্দ্রের অঙ্কের ক্লাস ছিল সাহিত্যের মতোই প্রাঞ্জল ৷ যাঁর ক্লাস করতে মুখিয়ে থাকত ছাত্ররা‚ তিনি বই লিখলে আখেরে লাভ পড়ুয়াদেরই ৷

তিনের দশকে প্রকাশিত হল ‘ নব পাটীগণিত ‘ ৷ ইউ এন ধর অ্যান্ড সন্স থেকে ৷ কেশবচন্দ্র নাগ থেকে তিনি হলেন কে সি নাগ ৷ শরৎচন্দ্র তাঁর নাম দিলেন গণিত শিল্পী ৷ দ্রুত জনপ্রিয় হল কে সি নাগের পাঠ্যপুস্তক ৷

একবার কে সি নাগের ডায়েরি দেখে ফেলেন ক্যালকাটা বুক হাউজের মালিক ৷ সেখানে লিখে রাখা কীভাবে কোন অঙ্ক করলে সুবিধে হবে ছাত্রদের ৷
প্রকাশক বললেন‚ ওই বই তিনি ছাপবেন
কে সি নাগ তো নারাজ ৷ অঙ্কের কোনও মানে বই বের করবেন না ৷ শেষে তাঁকে বলা হল ওটা হবে শিক্ষকদের গাইড বুক ৷ এ বার তিনি রাজি হলেন ৷ ১৯৪২ সালে বেরোলো ‘ ম্যাট্রিক ম্যাথেমেটিক্স ‘ ৷ এত চাহিদা হল‚ যে ছাপিয়ে কূল করা যেত না ৷

বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে কে সি নাগের গণিত বই ৷ পাকিস্তান বোর্ডের জন্যও লিখেছেন বই ৷ আছে তাঁর বইয়ের ব্রেল সংস্করণও ৷ পরে তাঁর বইয়ের গুণমান দেখে থাকত তাঁর পারিবারিক প্রকাশনা সংস্থা নাগ পাবলিশিং ৷ যাতে কিংবদন্তির নাম ক্ষুণ্ণ না হয়

গণিতের বাইরে বিবিধ বিষয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর ৷ তার মধ্যে একটি আধ্যাত্মিকতা ৷ শৈশবে পড়শি ছিলেন জিতেন্দ্রনাথ রায় ৷ যিনি পরে হন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ ৷ তাঁর নির্দেশ কেশবের কাছে ছিল বেদবাক্য ৷ গ্রহণ করেছিলেন শ্রী শ্রী সারদামায়ের শিষ্যত্ব ৷ গণিতের বাইরে বহু আধ্যাত্মিক লেখা অনুবাদ করেছেন ৷

সামিল হয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামেও ৷ গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন ৷ জেল খেটেছিলেন ম্যালেরিয়ায় ভুগতে ভুগতে ৷ পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রস্তাব দেন ভোটে দাঁড়ানোর ৷ সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন অঙ্কের মাস্টারমশাই ৷

আর ছিল খেলার নেশা ৷ ফুটবল ক্রিকেট টেনিস সব ৷ শেষদিকে আর মাঠে যেতে পারতেন না আদ্যন্ত এই মোহবাগানি ৷ রেডিয়োয় শুনতেন ধারাবিবরণী ৷

সেরকমই শুনছিলেন একদিন ৷ ১৯৮৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কানপুরে ভারত ইংল্যান্ড টেস্টে কেরিয়ারের শুরুতে তৃতীয় শতরানের পথে মহম্মদ আজহারউদ্দিন ৷ শুনতে শুনতেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ৷ দু বছর পর থেমে এল সব গণনা ৷ ১৯৮৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নেমে এল গণিতশাস্ত্রজ্ঞর জীবনের শেষ অঙ্ক ৷

তাঁর ছাত্রদের তালিকায় আছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়‚ সুভাষ মুখোপাধ্যায়‚ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়‚ বিকাশ রায়‚ রঞ্জিত মল্লিকের মতো দিকপালরা ৷ তাঁর বই বিক্রির রয়ালটির টাকা চলে যায় চ্যারিটি ফান্ডে ৷ তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমণি দেবীর নামে ফান্ড ৷ গুড়াপে লোকচক্ষুর আড়ালেই পালিত হয় তাঁর জন্মবার্ষিকী ৷ হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের খুব কাছেই থাকতেন কে সি নাগ ৷ এত উৎসব-মেলা-অনুষ্ঠান হয়‚ অথচ উপেক্ষিত থেকে যান তিনি ৷ যিনি আজীবন উৎসর্গ করেছিলেন ছাত্রকল্যাণে ৷ বইয়ে যাঁর নামের পাশে থাকত না ডিগ্রির উল্লেখ ৷ আসলে আমরা মানে বাঙালীরা বড়ই আত্মবিস্মৃত জাতি ৷

বিঃ দ্রঃ এই তথ্যটি জানার পর শেয়ার করতে ইচ্ছে হল আপনাদের সাথে তাই পোস্টটি করলাম ৷ এত বড় একজন ব্যক্তি সম্পর্কে জানা এবং জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেই আমার এই পোস্ট ৷ যাঁদের ভালো লাগবে অবশ্যই পড়বেন ৷ আমি এই পোস্টের মাধ্যমে অঙ্কের মাস্টারমশাই কেশব চন্দ্র নাগকে শ্রদ্ধা জানাই ৷

ফেব্রুয়ারী ৩rd, ২০১৭ by