Category: Uncategorised

ফেব্রুয়ারী ২৬th, ২০১৭ by অমিত মিত্র

বামপন্থীরা হিংসায় বিশ্বাস করে। কেরলে প্রচুর আরেসেস কর্মীকে হত্যা করেছে । তাদের গলা কাটা মৃতদেহের ছবি দেখেছি… একদম আইসিসের কায়দায় কাটা হয়েছে।

ভারতে রাজনৈতিক হত্যার যে ট্রাডিশন দেখছেন তা বামপন্থীদের’ কৃতিত্ব ‘। এখন ভারতের যেকয়টা রাজ্যে রাজনৈতিক হত্যা সবচেয়ে বেশি হয় তারমধ্যে সর্বাগ্রে আসে কেরল ও পশ্চিমবঙ্গের নাম। বিরোধীকে কচুকাটা করা, পুড়িয়ে মারা, শিশুকে রক্তমাখা ভাত খাওয়ানো…

কি করেনি এরা? এই আমাকেও কোরাপ্ট করে দিয়েছে। ওদের শিক্ষার প্রভাবেই তো’ মাফলারে পেঁচানো অধ্যাপকের ঘড়ঘড়ানি’ শুনে অদ্ভুত তৃপ্তি পাচ্ছি। দমাদম লাথ, থাপ্পড় দেখে উত্তেজিত হচ্ছি, বিড়ি ধরাচ্ছি, দাঁত বের করে হাসছি,” আচ্ছা দিয়েছে খানকির ছেলেটাকে, মার মার, এত ভয়াবহ ভাবে মার যাতে মুখ থেকে ছলকে বের হওয়া রক্তে রাজপথ ভেসে যায়”!

আফশোষ হয় বামপন্থী আমলে জন্মে। অন্য সময় হলে হয়তো এত স্যাডিস্ট, বর্বর হতাম না। ছোট থেকে হিংসার ভাষা শিখলাম।

ছোটবেলায় কোয়ার্টারের ছাদ থেকে দেখেছিলাম এক লাল ফেট্টিওয়ালাকে যে এক কং কর্মীর হাতে কাটারি চালাচ্ছিল। সিপিএমের সশস্ত্র লম্বা মিছিল দেখে ভয়ে বাবাকে শক্ত করে ধরতাম.. কালো কালো হিংস্র লোকগুলি টাঙি নিয়ে মিছিল করছে। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিতাম.. তখনই বুঝেছিলাম নিরাপদ পৃথিবী বলে কিছু নেই। লড়াই এখানে সবকিছু ঠিক করে দেয়।। অন্ধকারই পৃথিবীর আদীমতম কথা। রক্তের পিপাসাই ঠিক, স্বাভাবিক। মানুষও রক্তাক্ত হতে চায়।

Posted in Uncategorised

ফেব্রুয়ারী ২৫th, ২০১৭ by রাজা দেবনাথ

মোদের গরব মোদের আশা,
আরবি মেশানো বাংলা ভাষা….

২১শে ফেব্রুয়ারি,… আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস আজ। নিঃসন্দেহে একজন বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে অন্যান্য বাঙ্গালীদের মত, আমার কাছেও অত্যন্ত গর্বের দিন এটি।

মানুষ, আর কতকিছুর জন্যই তো বলিদান দিতে এগিয়ে আসেন, কিন্তু ভাষার দাবীতে রক্ত ঝরানো?… প্রান দেওয়া,… এগুলি ভাবলেও শরীরে রোমাঞ্চ জাগে। বিস্ময়ে হতে হয় বাকরুদ্ধ।

  • কিন্তু একবার ভাবুন তো, – ১৯৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারি, যে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সেদিন এতজন তাদের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিলেন,… দিয়েছিলেন প্রান বলিদান, তা কি আজকের এই সাম্প্রদায়িক ও রক্তাক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সার্থে…??

আরব সাম্রাজ্যবাদের ঊষর রেগিস্থানের নিরস-নিস্প্রান মরু-বালিরাশি আজ ঠিক যে ভাবে ওপারে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে ঢেকে দিতে কোমর বেঁধে নেমেছে, ঠিক তেমনি এপারেও তা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টির মুখ্য উদ্দেশ্যটিকেই ধ্বংস করতে সমুদ্যত হয়েছে।

এই ধরুন … আমার আপনার … বা অধিকাংশ বাঙ্গালী হিন্দুর কচি কাঁচারা .. দুলে দুলে আধো আধো কণ্ঠস্বরে যেখানে তাদের শৈশবের পাঠ মুখস্থ করে … এই বলে যে –

‘অ’য়ে অজগর আসছে তেড়ে,
‘আ’মটি আমি খাবো পেড়ে।
‘ইঁ’দুর ছানা ভয়ে মরে,
‘ঈ’গল পাখি পাছে ধরে।
‘উ’ট চলেছে মুখটি তুলে,
‘ঊ’টি আছে ঝুলে।
‘ঋ’ষী মশাই বসেন পূজায়,
“৯” লিকার যেন ডিকবাজি খায়।
‘এ’ক্কা গাড়ী খুব ছুটেছে,
‘ঐ’ দেখ ভাই চাঁদ উঠেছে।
‘ও’ল খেয়োনা ধরবে গলা,
‘ঔ’ষুধ খেতে মিছে বলা।

হ্যাঁ ওরাও পড়ে … সারি হয়ে বসে দুলে দুলে … সমস্বরে কচি কচি গলায় মিষ্টি সুরে ….
…. কিন্তু কি পড়ে শুনবেন?

‘অ’ = অজু করে নামায পড়,
মুসলমানী জীবন গড়।
বা,
“অ” – তে,
অজু করে নামাজ পড়, আল্লাহর নামে জিকির কর।
হতে হবে খাঁটি মুসলমান, সবই যে তারই দান।
‘আ’ = আজান দিলেন মুয়াজ্জিন,
মসজিদে যায় সব মুমিন।
বা,
“আ” – তে,
আল্লাহর পরে হযরত মুহাম্মদ (সৎ আদর্শ তিনি মোদের)।
আব্বা-আম্মা তাঁহার পরে, আদেশ মানব তাদের।
‘ই’ = ইসলামের পাঁচটি বেনা,
জরুরী তাই সব জানা।
‘ঈ’ = ঈদের দিনে মুসলমান, দীন
দুখীরে করে দান।
বা,
“ঈ” – তে,
ঈদের দিনে খুশি দেখো, ঈমানদার সব ভাই,
ঈর্ষা সবে দূর করিয়া, ঈদ গাহতে যাই।
‘উ’ = উঠ জেগে নিদ্রা হতে, পড় নামায
জামাত সাথে।
‘ঊ’ = ঊষাকালে কুরআন পড়ি, আল্লাহর
বাণী কষে ধরি।
‘ঋ’ = ঋণ করলে দুঃখ হবে, পথে –
ঘাটে লজ্জা পাবে।
‘এ’ = এক আল্লাহ্ যে মানবে,
দোজাহানে মুক্তি পাবে।
“এ” – তে,
এক আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা, এলমেদ্বীন কুরআন।
একতাই সুখের মূল, এক হও মুসলমান।

‘ঐ’ = ঐতো দেখি আল্লাহর ঘর,
ডাকছে মোদের জীবন ভর।
‘ও’ = ওজনে কম দিলে ভাই,
কেয়ামতে মুক্তি নাই।
‘ঔ’ = ঔষধ সেযে এলাজ করে,
মাঙলে দোয়া সম্মান বাড়ে।

বা,

“ক” – তে,
কালেমা পড়ে মুসলমান হব, কাফের নাহি থাকব
কুরআনের বিধান মান্য করে, কামেল মুমিন হব।
“খ” – তে,
খাবার খাব বিসমিল্লাহ পড়ে, খাদক নাহি হব
খালি মাথায় ভাত খাব না, খোঁজ গরীবের লব
“ঘ” – তে,
ঘৃনা থেকে বাঁচতে সুজন, ঘুষ নাহি খায়।
ঘোমটা মাথায় সতী নারী, ঘরের বাহিরে যায়।
“জ” – তে,
জুমআর নামাজ গরীবের হজ্জ, জামাতে নামাজ পড়ব।
জুলুম করা ছেড়ে দিয়ে, জিকির আল্লাহর করব।

“ঞ” – তে,
ঞ দেখো কষ্টে আছে, পিঠে বোঝা লইয়া।
ঞ এইবার হইল সুখী, মিঞা সাহেব হইয়া।
“ট” – তে,
টুপি পড়া নবীর সুন্নৎ, টাকার বড়াই হারাম।
টাকনুর উপর কাপড় পড়ে, টংগী ওয়াজ শুনতাম।

….. কি কেমন লাগল?

ভালো লাগলে তো খুবই ভালো। … আর তা যদি নাও লাগে, তবুও বলি, প্রস্তুত হন। চারিদিকে তেহট্ট, নবী দিবস আর ধূলাগড়ের ধূলার ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে চলতে চলতে,…..
– কে বলতে পারে, যে অদূর ভবিষ্যতে আপনার ভাবি প্রজন্মও এমনি ভাবে দুলে দুলে এসব পড়বে না….?
আপনারই ঘর থেকে একদিন, কচি সুরে … ভেসে আসবে না…?

……“‘অ’ তে অজু করে নামায পড়ে…..”

Posted in Uncategorised Tagged with: , ,

ফেব্রুয়ারী ২৫th, ২০১৭ by দীপ্তরূপ সাম্যদর্শী

দুরকমের দেশপ্রেম হয়।
এক, ইমোশনবাজারী দেশপ্রেম।
“নমো নমো নমো সুন্দরী মম আম্মি জন্মভুমি,
গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর ক‍্যাল খেয়ে থাকি আমি”…
এসব লিখলে ভক্ত পাওয়া যায়। কারণ ম‍্যাক্সিমাম পাবলিক মেরুদন্ডবিক্রিত সুবিধাবাদী আঁতেল। ফলে তারা হুলিয়ে এর খরিদ্দার হয়ে থাকে। wink emoticon
আরেকরকম দেশপ্রেম হয়।
“আমরা তোমার হিংস্রমতো গুন্ডাছেলে,
বিপদ এলে ডাক দিও মা, থাকব জানি,
তুমি চাপ নিও না,
আমরাআআআ
দরকারে মরতে জানি।”
এটাকে জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম বলে। এটাতে বাজারী করা একটু চাপ। কারন বাজারে প্রফিট ওঠার আগেই মরে যাবার চান্স থাকে, “কুইসলিং” বা “তোজোর কুকুর” হবার চান্স থাকে….. ফলে বুদ্ধিজীবদের কাছে জাতীয়তাবাদ ঘৃণিত। মরে গেলে তাদের প্রফিট কে দেবে? ট‍্যাগরা বলকে কটা লোক চেনে??
তাই “নন্দ বলিল দেশের জন‍্য জীবনটা যদি দিই,
নাহয় দিলাম, কিন্ত তাহলে আমার প্রফিট কি?”
…..
অত‌এব, “সকলে বলিল, ভ‍্যালারে প্রেমিক, বাইচ‍্যা থাউক সিরোখাল”..
.
#কিনজোলাব_ধান্দাবাদ

Posted in Uncategorised Tagged with: , ,

ফেব্রুয়ারী ৩rd, ২০১৭ by সুপ্রিয় ভদ্র

কেশব চন্দ্র নাগ নামটা নিশ্চয়ই শোনা শোনা লাগছে? বর্তমান প্রজন্মের ছেলে -মেয়েরা হয়ত নামটা শোনেই নি তবে আমরা তাঁর অঙ্ক বই থেকে অঙ্ক কষার সুযোগ পেয়েছি | তিনি কত বড় অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন সে কথাটা শুনেছি বহুবার ৷

চৌবাচ্চা দিয়ে জল বেরোচ্ছে আর ঢুকছে ৷ তেলমাখা বাঁশে বাঁদর উঠছে আর নামছে ৷ সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে ৷ প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে গতিময় ট্রেন‚ তাহলে ট্রেনের দৈর্ঘ্য কত হবে ?

স্কুল পেরোনো মধ্যবয়সীদের অফিসে ডেডলাইন চাপের দুঃস্বপ্নেও ফিরে আসে এই প্রশ্নগুলো ৷ কারণ স্কুলস্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে সাদা পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরে পাটীগণিত ৷ নাম তার ‘ কে সি নাগ ‘ ৷

কারও কাছে কে সি নাগ নামটা কে সি দাসের রসগোল্লার মতোই মধুময় ৷ কারও কাছে আবার কে সি পালের ছাতার শক্ত বাঁট ৷ কে সি নাগের অঙ্ক একদিকে শাস্তি ৷ আবার সেই অঙ্কের সমাধান নিজের হাতে কষা যেন অ্যাচিভমেন্ট ৷

তাঁর বই তো অনেক দেখেছি ৷ চলুন না এ বার একটু ব্যক্তি কে সি নাগকে দেখি ৷

স্বামী বিবেকানন্দ যে বছর শিকাগোয় বিশ্বজয় করলেন ‚ সে বছরেই হুগলির গুড়াপের নাগপাড়ায় জন্ম তাঁর ৷ ১৮৯৩-এর ১০ জুলাই ৷ সেদিন ছিল রথযাত্রা ৷ সন্তানের নাম ‘কেশবচন্দ্র‘ রেখেছিলেন বাবা রঘুনাথ ৷ কিন্তু সন্তানের শৈশবেই চলে গেলেন বাবা ৷ ছেলেকে বড় করতে শুরু হল মা ক্ষীরোদাসুন্দরী দেবীর কঠিন লড়াই ৷

গুড়াপে তখন সবেধন নীলমনি একটাই স্কুল ৷ সেখানেই ভর্তি হলেন শিশু কেশব ৷ পরে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন ভস্তারা যোগেশ্বর হাই স্কুলে ৷ ৩ মাইল দূরে সেই স্কুলে যেতে ভোররাত থেকে হাঁটতে শুরু করতেন কেশব ৷ আবার বাড়ি ফিরতেন সূর্য পাটে ডুবলে ৷ নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন কিষেনগঞ্জ হাই স্কুলে ৷

১৯১২ সালে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে কেশব তখন কলকাতার রিপন কলেজের ( আজকের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ) ছাত্র ৷ ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন আইএসসি ৷

এরপর যোগেশ্বর স্কুলে থার্ড মাস্টারি কিছুদিন ৷ সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনি ৷ নইলে স্কুলের সামান্য বেতনে বড় সংসার চালানো অসম্ভব ৷ কিন্তু তার মধ্যেই মনে হল শেষ করতে হবে উচ্চশিক্ষা ৷ বিজ্ঞান শাখায় না করে কেশবচন্দ্র স্নাতক হলেন অঙ্ক সংস্কৃত এবং কলাবিদ্যায় ৷ পেলেন বিএ ডিগ্রি ৷ এরপর কিষেণগঞ্জ স্কুলে গণিতের শিক্ষক ৷ পড়িয়েছিলেন বহরম পুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলেও ৷

তখন তাঁর ধ্যান জ্ঞান শুধুই গণিত ৷ কী করে ছাত্রদের অঙ্কভীতি দূর করা যায় ‚ কী করে গণিতকে আরও প্রাঞ্জল করে তোলা যায়‚ এই ছিল তাঁর স্বপ্ন ৷

তাঁর পড়ানোর খ্যাতি ছাড়িয়ে পড়ল ৷ স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে এলেন কলকাতায় ৷ ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে ৷ সেখান থেকেই প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন ৷

কলকাতায় প্রথমে থাকতেন রসা রোডের মেসে ৷ পরে দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনে বাড়ি করেছিলেন ৷

শিক্ষকতা নিয়েই মগ্ন ছিলেন কেশবচন্দ্র ৷ স্কুলে অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন কবি কালিদাস রায় ৷ তাঁর বাড়িতে বসত সাহিত্যিকদের আড্ডা ৷ মধ্যমণি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ৷ একদিন বৈঠকী মেজাজেই কথা সাহিত্যিক প্রস্তাব দিলেন বরং বই লিখুন কেশবচন্দ্র ৷ কিছুদিন পরে জোর করে বললেন কালিদাস রায় | যে কেশবচন্দ্রের অঙ্কের ক্লাস ছিল সাহিত্যের মতোই প্রাঞ্জল ৷ যাঁর ক্লাস করতে মুখিয়ে থাকত ছাত্ররা‚ তিনি বই লিখলে আখেরে লাভ পড়ুয়াদেরই ৷

তিনের দশকে প্রকাশিত হল ‘ নব পাটীগণিত ‘ ৷ ইউ এন ধর অ্যান্ড সন্স থেকে ৷ কেশবচন্দ্র নাগ থেকে তিনি হলেন কে সি নাগ ৷ শরৎচন্দ্র তাঁর নাম দিলেন গণিত শিল্পী ৷ দ্রুত জনপ্রিয় হল কে সি নাগের পাঠ্যপুস্তক ৷

একবার কে সি নাগের ডায়েরি দেখে ফেলেন ক্যালকাটা বুক হাউজের মালিক ৷ সেখানে লিখে রাখা কীভাবে কোন অঙ্ক করলে সুবিধে হবে ছাত্রদের ৷
প্রকাশক বললেন‚ ওই বই তিনি ছাপবেন
কে সি নাগ তো নারাজ ৷ অঙ্কের কোনও মানে বই বের করবেন না ৷ শেষে তাঁকে বলা হল ওটা হবে শিক্ষকদের গাইড বুক ৷ এ বার তিনি রাজি হলেন ৷ ১৯৪২ সালে বেরোলো ‘ ম্যাট্রিক ম্যাথেমেটিক্স ‘ ৷ এত চাহিদা হল‚ যে ছাপিয়ে কূল করা যেত না ৷

বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে কে সি নাগের গণিত বই ৷ পাকিস্তান বোর্ডের জন্যও লিখেছেন বই ৷ আছে তাঁর বইয়ের ব্রেল সংস্করণও ৷ পরে তাঁর বইয়ের গুণমান দেখে থাকত তাঁর পারিবারিক প্রকাশনা সংস্থা নাগ পাবলিশিং ৷ যাতে কিংবদন্তির নাম ক্ষুণ্ণ না হয়

গণিতের বাইরে বিবিধ বিষয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর ৷ তার মধ্যে একটি আধ্যাত্মিকতা ৷ শৈশবে পড়শি ছিলেন জিতেন্দ্রনাথ রায় ৷ যিনি পরে হন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ ৷ তাঁর নির্দেশ কেশবের কাছে ছিল বেদবাক্য ৷ গ্রহণ করেছিলেন শ্রী শ্রী সারদামায়ের শিষ্যত্ব ৷ গণিতের বাইরে বহু আধ্যাত্মিক লেখা অনুবাদ করেছেন ৷

সামিল হয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামেও ৷ গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন ৷ জেল খেটেছিলেন ম্যালেরিয়ায় ভুগতে ভুগতে ৷ পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রস্তাব দেন ভোটে দাঁড়ানোর ৷ সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন অঙ্কের মাস্টারমশাই ৷

আর ছিল খেলার নেশা ৷ ফুটবল ক্রিকেট টেনিস সব ৷ শেষদিকে আর মাঠে যেতে পারতেন না আদ্যন্ত এই মোহবাগানি ৷ রেডিয়োয় শুনতেন ধারাবিবরণী ৷

সেরকমই শুনছিলেন একদিন ৷ ১৯৮৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কানপুরে ভারত ইংল্যান্ড টেস্টে কেরিয়ারের শুরুতে তৃতীয় শতরানের পথে মহম্মদ আজহারউদ্দিন ৷ শুনতে শুনতেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ৷ দু বছর পর থেমে এল সব গণনা ৷ ১৯৮৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নেমে এল গণিতশাস্ত্রজ্ঞর জীবনের শেষ অঙ্ক ৷

তাঁর ছাত্রদের তালিকায় আছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়‚ সুভাষ মুখোপাধ্যায়‚ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়‚ বিকাশ রায়‚ রঞ্জিত মল্লিকের মতো দিকপালরা ৷ তাঁর বই বিক্রির রয়ালটির টাকা চলে যায় চ্যারিটি ফান্ডে ৷ তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমণি দেবীর নামে ফান্ড ৷ গুড়াপে লোকচক্ষুর আড়ালেই পালিত হয় তাঁর জন্মবার্ষিকী ৷ হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের খুব কাছেই থাকতেন কে সি নাগ ৷ এত উৎসব-মেলা-অনুষ্ঠান হয়‚ অথচ উপেক্ষিত থেকে যান তিনি ৷ যিনি আজীবন উৎসর্গ করেছিলেন ছাত্রকল্যাণে ৷ বইয়ে যাঁর নামের পাশে থাকত না ডিগ্রির উল্লেখ ৷ আসলে আমরা মানে বাঙালীরা বড়ই আত্মবিস্মৃত জাতি ৷

বিঃ দ্রঃ এই তথ্যটি জানার পর শেয়ার করতে ইচ্ছে হল আপনাদের সাথে তাই পোস্টটি করলাম ৷ এত বড় একজন ব্যক্তি সম্পর্কে জানা এবং জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেই আমার এই পোস্ট ৷ যাঁদের ভালো লাগবে অবশ্যই পড়বেন ৷ আমি এই পোস্টের মাধ্যমে অঙ্কের মাস্টারমশাই কেশব চন্দ্র নাগকে শ্রদ্ধা জানাই ৷

Posted in Uncategorised Tagged with: , , ,

ফেব্রুয়ারী ২nd, ২০১৭ by দীপ্তরূপ সাম্যদর্শী

মার্ক্স পরিচারিকার প্রতি আগ্রাসী হয়েছিলেন। মার্ক্সবাদীরা অনিতা দেওয়ানের প্রতি। মুহম্মদ সাফিয়ার প্রতি।
কামদুনির শিপ্রা বা দিল্লীর দামিনীরা মার্ক্সবাদী হয়ে উঠতে পারেনি তাই আগ্রাসী পুরুষ পছন্দ করেনি।
আগ্রাসী পুরুষ তখন তাদের রেপ করে। পারভার্সন কি ও কেন, আগ্রাসন কি ও কেন এসব নিয়ে মার্ক্সবাদীরা প্রয়োজনমত বক্তব‍্য দেয়। এরাই বলেছিল, মুসলমান পুরুষের দম আছে বলেই, তারা বোরখা পরাতে পারে!!!
.
“ইতিহাসকে নিজের মত ব‍্যাখ‍্যা” যদি হিন্দু অনুকুলে হয়, তবে তা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা। যদি মুসলমান রেপিস্টের ডিফেন্ডে হয়, তবে ইতিহাস বিকৃতি নয় ওটা ইতিহাসের “প্রোগ্রেসিভ লেফ্টিজম”…
.
এদের মার্ক্সবাদী বলে। যাদবপুরের মার্ক্সবাদী একলব‍্য চৌধুরী, জেএন‌ইউর আনমোল রতন…. এরা নারীকে পুরুষের আগ্রাসনের বাইরে কখনো ভাবতে পারেনি পারবে না। যে মনুবাদের এরা “তথাকথিত” নিন্দা করে সেই মনুও এক‌ই ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। কি মিল! এত মিলের কারণেই কমিউনিস্ট পার্টির উপরতলায় নীচু জাতের জায়গা হয় না…
কচকচি থাক। আপনি নারী? অ-মুসলিম? যেদিন মামুদ, খলজীর বংশধররা আপনাকে ধর্ষণ করতে আসবে চিৎকার করবেন না। মনে রাখবেন মার্ক্সবাদ আপনাকে আগ্রাসী পুরুষকে বরণ করতে শিখিয়েছে। গান্ধীজীও বলেছিলেন, হিন্দু মেয়েদের যদি মুসলমান কোন ভাই ধর্ষণ করতে চান তো চুপচাপ শুয়ে পড়তে…
মার্ক্সবাদীরা তো গান্ধীবাদীই।
.
হে ক্লারা তুমি এঁটো জলের গ্লাস‌ই….. মাওবাদী পুরুষরা আগ্রাসী, তারা একটা মহিলা কমরেডকে দশজনে মিলে এমনি এমনি খায়?? মহিলা কমরেডরা আগ্রাসী পুরুষ কমরেডদের ভালোবাসতে বাধ‍্য, ন‌ইলে পার্টি তাদের স‍্যাক করে।
আপনি নারী? আপনি পুরুষের আগ্রাসন পছন্দ করেন না??
সে কি?? তাহলে আপনি মার্ক্সবাদী কি করে হবেন??

মুহম্মদ আগ্রাসী ছিলেন, কিন্তু পেট বাঁধিয়ে পালান নি, হারেমে পুষতেন। কিন্তু মার্ক্স আরো আগ্রাসী ছিলেন। স্বাধীন বলেই পেট বাঁধিয়ে কেটে পড়তে সফল….
বাঁকুড়া মেমে নিশ্চয়‌ই মার্ক্সবাদী। কারণ ঐ শিশুটি তার বেবীফ‍্যাটে পুরুষের আগ্রাসন পছন্দ করেনি একথা মার্ক্স কোথাও লিখে যাননি।
ছয় বছরের মেয়েও যখন চুয়ান্ন বছরের আগ্রাসী পুরুষকে পছন্দ করেছিল……
.
বিশ্বরূপম, 2013 সালের সাত‌ই ফেব্রুয়ারীর পরের একমাস, মার্ক্সবাদী ভদ্রলোকদের টাইমলাইনে এরকম কিচ্ছু পাবেন না। ঐ সিনেমায় কোন ইতিহাস বিকৃতি ছিল না। পাতি ফিকশন। তবুও মার্ক্সবাদীদের মাতৃসংগঠন ইসলামের আগ্রাসী পুরুষরা হল ভাঙচুর করেছিল।
মার্ক্সবাদীরা আগ্রাসী পুরুষদের পছন্দ করে তো….
.
উই নিড ন‍্যাশনালিস্ট টেরোরিজম। কালচারালি অ্যান্ড সোস‍্যালি…. মার্ক্সবাদীরা আগ্রাসী শাসক পছন্দ করে। খোমেইনী বা সুহার্তোর মত। 😉

Posted in Uncategorised Tagged with: , , , , ,

ফেব্রুয়ারী ২nd, ২০১৭ by রাজা দেবনাথ

কি বলবেন একে…?
মায়ের কাছে মাসির গল্প … ? না, কামারের কাছে ছুঁচ বেচতে যাওয়া ….??

কোন এক বাজারী পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে দেখলাম গুগুলের সিইও শ্রী সুন্দর পিচাই এবং ফেসবুকের মালিক … শ্রী মার্ক জুকেরবার্গ … আপনারা দুজনেই নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট শ্রী ডোনাল্ড ট্র্যাম্প প্রবর্তিত সাম্প্রতিক মুসলিম বিদ্বেষী আমেরিকান অবিভাসন নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। আপনাদের বক্তব্য, … এতে আমেরিকার ব্যবসার ক্ষতি হবে। অর্থনীতির উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে ইত্যাদি … ইত্যাদি …।।

আপনাদের আর কি? … বলেই খালাস। দুটো হাততালি আর পয়সার লোভে আপনারা যা খুশি তাই বলতেই পারেন। কিন্তু যাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে শ্রী ডোনাল্ড ট্র্যাম্প আজকে এই জায়গায় এসেছেন, তাদের মতামতের গুরুত্বের দিকটা তাঁকে যেমন ভাবতে হয়েছে, … তেমনই অপর দিকে প্রতিটি আমেরিকাবাসীর জান-মাল-নারীর সম্মানের গুরুভারও তাঁকেই বহন করতে হবে আগামী চার বছর। তার জবাবও দিতে হবে তাঁকেই।

শ্রী ট্র্যাম্প … কোরান-হাদীস জানেন। ইসলাম’কে বোঝেন। সত্যকে ভালোবাসেন। তাকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাই তিনি অবলীলায় সন্ত্রাসবাদের ধর্ম যে আছে, … তা যে সত্যিই হয়, – তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। সন্ত্রাসবাদের ধর্ম কে চিহ্নিত করতে পেরে যে ভাবে রাশিয়া কিংবা জাপান … এবং ইজরায়েল আজ সন্ত্রাস মুক্ত, … তেমনই সেই পথে হেঁটেই তিনি এই পৃথিবীতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছেন। – এটা বুঝি খারাপ?… বুঝি অন্যায়??

তা, সেই খারাপে বা অন্যায়ে আপনাদের কাজ কি? আপনারা বিষ্ঠা খাচ্ছেন, খেয়ে ভালো আছেন – তা খান না কেন? তাই বলে ট্র্যাম্প সাহেবকেও আপনাদের মত দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য সেবন করতে হবে নাকি? .. কি আপদ !!

এনি ওয়ে, ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন স্যার, … শ্রী ট্র্যাম্প একজন সফল ব্যবসায়ী। আর দশজন রাজনীতিবীদের মত নন। বাস্তবের কাছাকাছি থাকার মানুষ তিনি। … বিশিষ্ট ধনকুবেরও বটে। আপনাদের থেকেও অভিজ্ঞতাতেও প্রবীণ। … তাঁর পয়সাকড়িও যে আপনাদের থেকে খুব একটা কম আছে বলে মনে হয় না। অতয়েব স্বাভাবিক ভাবেই, লাভ ক্ষতির অঙ্কটা যে তিনি আপনাদের থেকে নেহাত কম বোঝেন, তা মনে হবার কোন কারন আছে কি?

তাই এটাই কি সব চেয়ে ভালো হয় না – যে, আপনারা আপনাদের এই অবাঞ্ছিত জ্ঞানবিতরণ ক্ষণিক বন্ধ রাখেন। মনে রাখবেন, … দেশটা আমেরিকা। ভারতের মত ন্যাকাষষ্ঠী নয়, যে নিজের ক্ষতি করে অপরের ইচ্ছাপুরন করতে যাবে। দেশটার জন্মই হয়েছে আব্রাহাম লিংকনের মত প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়কের হাত ধরে সিভিল ওয়্যারের মাধ্যমে রক্ত ঝরিয়ে, – যেখানে আপনাদের এইসব ফুটো মানবিকতার তত্ত্ব অচল।

কই? আইসিসের সহি মুসলমানেরা যখন তাদের তান্ডবে পৃথিবীর মানুষের বুকের রক্ত হীমায়িত করে ফেলে। বাংলাদেশ – পাকিস্তানের সাহাবী মুসলমানেদের হাতে নির্মম ভাবে নির্যাতিত হওয়া হিন্দুদের আর্তনাদ আর চোখের জলে যখন হিমালয়েরও পাষান হৃদয় গলে জল হয়ে যায়, – তখন আপনাদের এই সব পাণ্ডিত্যের তত্ত্ব কোথায় থাকে মশাই?

তাই বলি, ওহে … এখানে আপনাদের এই সব মেকী মানবপ্রেমের পসার আর জমবে না। পারলে অন্য মার্কেটে যান। বরং সরকারী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার বেয়াদপিতে আপনাদেরই না এবার ও দেশ থেকে ঘাড় ধাক্কা খেতে হয়..! তখন আমও যাবে …. আর ছালাও ..।।

– একবার ভেবে দেখবেন প্লিজ …।।

Posted in Uncategorised

ফেব্রুয়ারী ২nd, ২০১৭ by অমিত মিত্র

আমাদের স্কুলে ক্লাস ফাইভ থেকে ১০ সরস্বতী পুজোর হেড ছিল শেখ বাদশা নামে এক ক্লাসমেট। মণ্ডপসজ্জা থেকে পুজোর বাজার সব কিছুতেই দায়িত্ব নিত। পুজোর পরের দিন মোচ্ছবের বিতরণে মুসলিম ছেলেরাও অংশ নিত। তারাও প্রসাদ খেত।
তো এটা ছিল আমাদের এলাকার ছবি। তখনও বিষ মেশেনি। ছোটখাটো মতপার্থক্য, সাম্প্রদায়িকতা থাকলেও যোগাযোগ ছিল.. আদানপ্রদান ছিল।
বামপন্থী নামের একদল কৃমিকীট, নর্দমার সন্তান প্রথম বিষ ঢোকালো… সেকুলারিজমের দোহাই দিয়ে বললো, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কেন হিন্দুর ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে? বন্ধ হোক পুজো পাঠ।
মুসলিমদের মধ্যে যারা মৌলবাদী তারা বামপন্থীদের এই মতামত লুফে নিল… সাহস বাড়লো তাদের। তারাও বলতে শুরু করলো।
পুজোর আগের রাতের কথা, হিন্দু ছেলেরা মাল খেয়ে টাল। মন্ডপ বানাবে কে? পুজোর আয়োজনই বা করবে কে? আমি আর দুই বন্ধু গিয়ে পাশের মুসলিম পাড়ার স্টুডেন্ট দের ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এলাম। ওরা ১৫-১৬ জন এসে সব কাজ করলো। এরকম পরিবেশ ছিল আমাদের। আমরাও মহরমে মাতোয়ারা হতাম। ওরা পুজোতে। সরাসরি ধর্মাচরণ না করলেও আনন্দ করা যায়। বাংলায় অতীতে দাঙ্গা হয়েছে এটা একটা বাস্তব…. আবার প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় পারস্পরিক সৌহার্দ্য ছিল এটাও বাস্তব।
বামপন্থী নামের নোংরা নর্দমার ফসলদের এটা সহ্য হয়নি। মুসলিমদের মধ্যে মৌলবাদী এলিমেন্টকে দিনের পর দিন সাহস দিয়ে গেছে… তাদের মুখে ভাষা জুগিয়েছে.. মুসলিমদের মধ্যে মৌলবাদী ছিল কিন্তু তারা মুসলিম সমাজের নিয়ন্ত্রক ছিলনা… বামপন্থী জাইরোরা তাদের নিয়ন্ত্রক বানিয়েছে…. এভাবে বাংলার মেরুকরণ করে সাম্প্রদায়িক নোংরা বামপন্থী নামের পশুগুলি বাংলার সর্বনাশ করেছে।
হ্যাঁ আমার ঘৃনার টপ টেনে বামপন্থা প্রথমে আসে।

Posted in Uncategorised Tagged with: , , ,

জানুয়ারী ২৭th, ২০১৭ by ধ্রুব

লিনাক্স, একটি জঘন্য অপারেটিং সিস্টেম

আজকাল কি এক হয়েছে যে সে দেখি কম্পিউটারে লিনাক্স লাগায়। যেন একটা ফ্যাশান হয়ে গেছে। বলে নাকি উইন্ডোেজ, যেটাকে রা ব্যঙ্গ করে জানালা, বাতায়নী ইত্যাদি বলে ডেকে থাকে, তার চেযে লিনাক্স অনেক গুণে ভাল। তো তাদের এইসব কথা শুনে মেতে গিয়ে আমিও লিনাক্স লাগালাম। তো লিনাক্স মানে ডেস্কটপে মূলত উবুন্টুকেই বোঝাচ্ছি যেহেতু এটাই বেশি ব্যবহার হয়। তাছাড়া মিন্ট কেও হালকা ভাবে টাচ করে যাব। তো এবার চলুন দেখে নিই বহুল প্রচারিত লিনাক্সের আসল চেহাড়া।

১)জটিল ইন্সটলেশন পদ্ধতি:-
ধরুন আপনি উইন্ডোজ ইন্সটল করবেন, তো প্রথমে আপনার দরকার একখানা সিডি। এটা হয় চড়া দামে বাজার থেকে কিনতে হবে, নয়ত ক্র্যাক বা ‘চোরাই’ মাল আনতে হবে। এবার এটাকে সিডি ড্রাইভে ঢুকিয়ে বুট করুন। এবার কয়েকটা স্টেপ ফলো করুন। এরপর পারটিশন করুন। এবহার মিনিট চল্লিশ অপেক্ষা করুন। ইন্সটল হবে। এরপর একে একে ড্রাইভার আর অন্য দু চারটে সফটওয়্যার ইন্সটল করলেই আপনার পিসি রেডি। মাত্র ঘন্টা দুয়েকের ব্যাপার।
অন্যদিকে লিনাক্সে দেখুন। প্রথমে একেবারে বিনামূল্যে আইএসও ফাইল নামাও। তারপরে সেটাকে সিডিতে বার্ন করো। বা অতি অল্প ডোনেশন দিয়ে রেডি সিডি আানাও। এবার সেটাকে ইনসার্ট করো। লাইভ চালিয়ে দেখে নাও সব ঠিক আছে কিনা। এরপর ইন্সটল আইকনে ক্লিক করো। এবার খুব সহজে দুখানা পার্টিশন বানাও। কনফার্ম করো। ইন্সটল শুরু হবে। এরপর ইন্সটল শেষে রিস্টার্ট নেবে। ব্যস পিসি রেডি! কোন অতিরিক্ত ড্রাইভার ইত্যাদি ছাড়াই দীর্ঘ্য পনেরো মিনিট অপেক্ষা করে তবে ইন্সটল হয়! কি জঘন্য বলুন তো? ড্রাইভার ছাড়াই ওএস? ইয়ার্কি নাকি? এটা কি ড্রাইভারের অপমান নয়?

২)স্পীড:-
উইন্ডোজে কত কাজ করতে হয়। নিয়মিত ডিফ্র্যাগমেন্ট, অপ্রয়োজনিয় ফাইল দূরীকরন, ইত্যাদি কত কি! এসব না করলে মেশিন দু সপ্তাহের মধ্যেই স্লো হয়ে পরবে। করলে মাস খানেক ঠিক থাকবে। তখন আাবার আগের স্পীড পেতে দাও রিইন্সটল! ওহ্! কতই না গুরুগম্ভীর ব্লগ লেখা হয় উইন্ডোজের সপীড বাড়ানো নিয়ে! আর সেখানে লিনাক্স কিনা একবছর পরেও ঘোড়ার মত দৌড়ায়! আর এতে ফাইল সিস্টে-ম এত গোছানো যে ডিফ্র্যাগমেন্টের অপশনই নেই! এটা একটা কথা হল?

৩)সফটওয়্যার ইন্সটল:-
ধরুন উইন্ডোজে একখানা নতুন সফ্টওয়্যার ইন্সটল করবেন। প্রথমে গুগল ঘেঁটে সফটওয়্যার বাছুন। তারপর সেটা নামান বা ড়অ দামে সিডি কিনুন। এরপর ইএক্সই ফাইলে ক্লিক করে একগাদাদ নেক্সট নেক্সট চাপুন। তারপর প্রোডাক্ট কি মারুন। ব্যস আপনার সফ্টওয়্যার রেডি। অন্যদিকে উবুন্টুতে দেখুন। সতটওয়্যার সেন্টার না কি বলে একখানা মেনু আছে যেটা চালালেই হাজার হাজার সফটওয়্যার সুন্দর করে ক্যাটেগরি অনুযায়ি সাজানো অবস্থায় চলে আসে! সার্চ করে বা লিস্ট দেখে পছন্দের সফ্টওয়্যারে ক্লিকন করে ইন্সট৬ল বাটন চাপলেই আপনা থেকেই সফটওয়্যার ইন্সটল হয়ে যায়! বলি একি ছেলেখেলা নাকি হ্যাঁ?

৪)ভাইরাস:-
কম্পিউটারের অন্যতম একটা সমস্যা হল ভাইরাস। এমনি সব ঠিক আছে, হঠাৎ একদি৯ন দেখলেন আপনার দরকারী ফাইলগুলো হাওয়া! এর জন্য দামি অ্যান্টিভাইরাস ইউজ করতে হয়। সেটাকে সময়ে সময়ে আপদেট করলেই হল। তাও যখন ডাটা কস বা অন্য কিছু হয় তখন যে কি অভিজ্ঞতা হয়, সেটা যার হয়েছে সেই জানে। এবনার লিনাক্সের দিকে দেখুন। এতে ভাইরাস ই হয়না! বোঝো কান্ড! আর এই কারনেই এতে কোন অ্যান্টি ভাইরাসও লাগেনা! কি বিশ্রী ব্যাপার ভাবুন!

৫)ডেস্কটপ এনভায়রোমেন্ট:-
উইন্ডোজে আপনি সুন্দর এফেক্টওয়ালা একটা ডেস্কটপ পাবেন। এতেও যদি মন না ওঠে তখন বাজারে হাজারো থিম এর মধ্য থে-কে ইচ্ছামত থিম বাছুন। আরো কত এফেক্ট আসবে। সেখানে লিনাক্সে দেখুন। উবুন্টুর ডিফল্ট ডেস্কটপ ইউনিটি তো রয়েইছে, সাথে- জিনোম, কেডিই, এক্সএফই, ইত্যাদি আরো কতরকম এনভঅয়রোমেন্ট! এদের প্রত্যেকের কাজও আালাদা। আাবার দেখুন, এতে একাধিক ওয়ার্কস্পেস আছে। মানে ওই ব্রাউজারের আালাদা উইন্ডোর মত আালাদা আালাদা ভাগে আালাদা আলাদা অ্যাপ চালানো যায়! এসব কি হচ্ছে হ্যাঁ?

৬)প্রোগ্রাম খোজা :-
উইন্ডোজে দরকারি প্রোগ্রাম খুজে চালানো কত সোজা। প্রথমে স্টার্ট মেনুতে ক্লিক করো। এরবর বিশাল লিস্ট থেকে খুঁজে বের করে ক্লিক করলেই হল। কিনবা নির্দিষ্ট কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ দাও। যেমন এমএস ওয়ার্ডের জন্য winword, ভিসুয়্যাল স্টুডিওর জন্য devenv এইরকম সহজেই বোঝা যায় এমন কিছু কিওয়ার্দ। এইবার উবুন্টুতে দেখুন। এতে ক্যাটেগরি অনুযায়ি সব অ্যাপস সুন্দর করে সাজানো থাকে। তাও খুঁজে না পেলে কাছাকাছি কিছু নাম, এমনকি কাজ ধরে সার্চ দিলেও আরো কয়েকটা রেজাল্টের সাথে কাঙ্খিত জিনিসটা চলে আসে। এ কি গুগল নহাকি যে যাই লিখি আন্দাজে বুঝে নিয়ে ঠিক খুঁজে বার করে দেবে? মগের মুলুক নাকি?

এইভাবে লিনাক্সের খারাপ দিকের কথা বলে শেষ করা যাবেনা। এই জঘন্য ওএস কেউ ইউজ করে? কি জটিল জিনিস! যা তা সব। তাই লিনাক্স দেখলেই তেড়ে যেতে ইচ্ছা করে। কেউ কোনদিন লিনাক্স ইউজ করবেননা।

Posted in Uncategorised

জানুয়ারী ২৬th, ২০১৭ by Kalidas

এই প্রজাতান্ত্রিক দিবসে প্রধান অতিথি আরব আমিরশাহির যুবরাজ শেখ মহম্মদ বিন জাভেদ আল নহিয়ান। তাঁর এই ভারত সফরেই দু’দেশ স্ট্র্যাটেজিক অয়েল রিজার্ভ নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হল।

 

ভারতের বর্তমান আপৎকালীন তেল ভাণ্ডারের যা আকার, তাতে সেই ভাণ্ডার পুরোপুরি পূর্ণ থাকলে ১০ দিন থেকে দু’সপ্তাহ পর্যন্ত গোটা দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু ভাণ্ডার পুরোপুরি পূর্ণ নয় এখনও। যতটা বাকি, ততটাই পূরণ করে দেবে আরব আমিরশাহি। বুধবার এমনই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে দু’দেশের মধ্যে। ২০২০ সালের মধ্যে ভারত তার আপৎকালীন তেল ভাণ্ডারকে বর্তমান আকারের সাড়ে তিন গুণে নিয়ে যেতে চায় বলে খবর। আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক অয়েল রিজার্ভের আকার পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়। এই মুহূর্তে তার যা আকার, তাতে গোটা আমেরিকার দু’মাসের জ্বালানি তেলের চাহিদা সেই ভাণ্ডার মেটাতে পারে। চিনের স্ট্র্যাটেজিক অয়েল রিজার্ভের আকারও যথেষ্ট বড়। কিন্তু সঠিক হিসেব চিন প্রকাশ করে না। বেজিং শুধু জানিয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক অয়েল রিজার্ভে এতটাই অশোধিত তেল চিন জমিয়ে ফেলতে চায়, যাতে তেল আমদানি না করেই অন্তত তিন মাস গোটা চিনের চাহিদা পূরণ করা যায়।

ভারতের স্ট্র্যাটেজিক অয়েল রিজার্ভে কম-বেশি ৩ কোটি ৭০ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের তেল ভাণ্ডারে ৭৫ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল রয়েছে। কর্নাটকের উদুপিতে রয়েছে আর একটি ভাণ্ডার। সেখানে মজুত রাখা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল। কর্নাটকেরই ম্যাঙ্গালোরে তৃতীয় অয়েল রিজার্ভটি গড়ে তোলা হয়েছে। সেটিতে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল মজুত রাখায় যায়। কিন্তু রয়েছে ৬০ লক্ষ ব্যারেলের মতো। বাকি অর্ধেকটা পূরণ করার জন্য আরও প্রায় ৬০ লক্ষ ব্যারেল তেল প্রয়োজন। আরব আমিরশাহি সেই ভারতকে সরবরাহ করতে চলেছে

Posted in Uncategorised

জানুয়ারী ২১st, ২০১৭ by admin

ফিরে এলাম,সবাইকে অভিনন্দন ,আজ থেকে বর্ণপরিচয় আবার আগের মত চলবে…

Posted in Uncategorised

এপ্রিল ২৬th, ২০১৬ by Niranjan Nayak

দাদা যারা এই ব্লগটি রক্ষণাবেক্ষন করছেন তারা প্রচারের জন্য কি করছেন?
#admin

Posted in Uncategorised

জুন ২৭th, ২০১৫ by master2012

—- অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

“I want to suck your big penis” – চমকাবেন না। ফেসবুকের ইনবক্সে এরকম মেসেজ পাওয়ার এরকম নাছোড় অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেকেরই হয়েছে। ফেসবুকে এরকম অনেক নারীপুরুষ তাঁদের যৌনসঙ্গী খুঁজতে সরাসরি এইভাবে প্রস্তাব রাখে। এঁরা আদতে সমকামী। পুরুষ খোঁজে পুরুষকে, নারী খোঁজে নারীকে। প্রথম পক্ষ ‘গে’, অপরপক্ষ ‘লেসবিয়ান’।বাজারি নাম ‘হিজড়ে’ বা ‘হিজড়া’।

হিজড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবহৃত একটি পরিভাষা — বিশেষ করে ভারতের ট্রান্সসেক্সুয়াল বা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে বুঝিয়ে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়, মূলত তারাই হিজড়া। হিজড়া শব্দের অপর অর্থ হচ্ছে ‘ট্রান্সজেন্ডার’, ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বোঝায় যা দৈহিক বা জেনেটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোনো শ্রেণিতে পড়ে না। প্রকৃতিতে কিছু মানুষ নারী এবং পুরুষের যৌথ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলা ভাষায় এই ধরনের মানুষগুলো হিজড়া নামে পরিচিত। সমার্থক শব্দে শিখণ্ডী, বৃহন্নলা, তৃতীয় লিঙ্গ, উভলিঙ্গ, নপুংসক, ট্রান্সজেন্ডার (ইংরেজি), ইনুখ (হিব্রু), মুখান্নাতুন (আরবি), মাসি, বৌদি, চাচা, তাউ, ওস্তাদ, মাংলিমুখী, কুলিমাদর, ভিলাইমাদর, মামা, পিসি, অজনিকা ষণ্ড, অজনক, সুবিদ, কঞ্চুকী, মহল্লক, ছিন্নমুষ্ক, আক্তা, পুংস্তহীন ইত্যাদি। হরিদ্বারে হিজড়াদের সকলে তাওজি বা পণ্ডিতজি বলেপৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে হিজড়াদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে হিজড়া : হজরত ইব্রাহিমের বংশধরদের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে প্রচারিত ধর্মগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় ইব্রাহিমীয় ধর্ম। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম — এগুলো সবই ইব্রাহিমীয় ধর্ম। প্রতিটি ইব্রাহিমীয় ধর্ম পুরুষ এবং নারী সৃষ্টির ব্যাপারে আদম এবং হাওয়া (ইভ)-এর গল্প বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ প্রথমে মাটি থেকে তৈরি করেন আদমকে। আদমের বুকের পাঁজর দিয়ে তৈরি করেন বিবি হাওয়াকে। তাহলে আল্লাহ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কিভাবে তৈরি করেন ? নারী ও পুরুষের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বা হিজড়া কীভাবে সৃষ্টি করা হল, এই বিষয়ে পৃথিবীর কোনো ধর্মেই আলোচনা করা হয়নি।

ইসলামে তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের “মুখান্নাতুন” হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরবি ভাষায় “মুখান্নাতুন” বলতে মেয়েদের মত আচরণকারী পুরুষদেরকে বোঝানো হয়। এক্ষেত্রে যেহেতু শুধুমাত্র মেল টু ফিমেল ট্রান্সসেক্সুয়ালদের বোঝানো হয়, তাই আরবি “মুখান্নাতুন” হিব্রু সারিস বা ইংরেজি “ইউনুখ”-এর সমার্থক শব্দ নয়। কোরানে কোথাও “মুখান্নাতুন” সম্পর্কে কিছু বলা হয় নাই। কিন্তু হাদিসে “মুখান্নাতুন”-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

আন নবি বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, একজন “মুখান্নাতুন” হচ্ছে সেই পুরুষ, যার চলাফেরায়, চেহারায় এবং কথাবার্তায় নারী আচরণ বহন করে। তারা দুই প্রকারের : প্রথম প্রকারের হচ্ছে তারাই যারা এই ধরনের আচরণ ইচ্ছাকৃতভাবে করে না এবং তাদের এই ব্যবহারে কোনো দোষ নেই, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো লজ্জা নেই যতক্ষণ পর্যন্ত তারা কোনো অবৈধ কাজ না করে এবং পতিতাবৃত্তিতে না জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যক্তি হচ্ছে তারাই যারা অনৈতিক উদ্দেশ্যে মেয়েলি আচরণ করে। হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন – হিজড়ারা জিনদের সন্তান। এক ব্যক্তি আব্বাসকে প্রশ্ন করেছিলেন – এটা কেমন করে হতে পারে ? জবাবে তিনি বলেছিলেন – “আল্লাহ ও রসুল (সাঃ) নিষেধ করেছেন যে মানুষ যেন তাঁর স্ত্রীর পিরিয়ড বা মাসিক স্রাব চলাকালে যৌনমিলন না করে”। সুতরাং কোনো মহিলার সঙ্গে তার ঋতুস্রাব হলে শয়তান তার আগে থাকে এবং সেই শয়তান দ্বারা ওই মহিলা গর্ভবতী হয় এবং হিজড়া সন্তান (খুন্নাস) প্রসব করে (সুরা বাণী ইস্রাইল – আর রাহমান-৫৪, ইবনে আবি হাতিম, হাকিম তিরমিজি)। ইসলামী দেশগুলির মধ্যে ইরানে সব থেকে বেশি রুপান্তরকামী অপারেশন করা হয়। তারা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিকে যে-কোনো এক লিঙ্গে রুপান্তর হওয়ার সুযোগ দেয়।

হিন্দু ধর্মে হিজড়া : দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরকে সাধারণত হিজড়া নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু অঞ্চলভেদে ভাষাভেদে হিজড়াকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। এই অঞ্চলে হিজড়াদেরকে সামাজিক ভাবে মূল্যায়িত করা হয়। তারা সমাজ থেকে দূরে বাস করতে বাধ্য হয়। দূরপাল্লা ট্রেনে বা বাজারে ভিক্ষাবৃত্তি, পতিতাবৃত্তিই তাদের প্রধান পেশা। হিন্দুদর্শনে তৃতীয় লিঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। নারী পুরুষের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত এই শ্রেণিকে “তৃতীয় প্রকৃতি” হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রে এই ধরনের মানুষকে আলাদাভাবে পুরুষ বা নারী হিসাবে বিবেচনা করা হত না। তাদেরকে জন্মসূত্রে তৃতীয় প্রকৃতি হিসেবে গণ্য করা হত। তাদের কাছে সাধারণ নারী-পুরুষের মতো ব্যবহার প্রত্যাশা করা হত না। আরাবানী হিজড়ারা আরাবান দেবতার পুজো করে। অনেক মন্দিরে হিজড়াদের নাচের ব্যবস্থা করা হয়। অনেক হিন্দু বিশ্বাস করেন হিজড়াদের আশীর্বাদ করার এবং অভিশাপ দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা আছে।

খ্রিস্টান ধর্মে হিজড়া : গ্রিক Eunochos থেকে Eunuchs শব্দটি এসেছে। খ্রিস্টধর্মের নিউ টেস্টামেন্টে স্পষ্ট করে তৃতীয় লিঙ্গ ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যদিও এখানে Eunuchs বলতে নপুংশক ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে। বিবাহ এবং বিচ্ছেদ সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় জিশু বলেন, কিছু মানুষ জন্ম থেকেই Eunuchs, আবার কিছু মানুষ অন্যদের দ্বারা Eunuchs -এ পরিণত হয় এবং আরও কিছু মানুষ আছে যারা স্বর্গরাজ্যের জন্য নিজদেরকে Eunuchs-এ রূপান্তরিত করে।

২০০০ সালে ক্যাথলিক সম্মেলনের ডকট্রিন অফ ফেইথের উপসংহারে বলা হয়, চার্চের দৃষ্টিতে একজন মানুষ ট্রান্সসেক্সুয়াল সার্জিকাল অপারেশনের মাধ্যমে একজন মানুষকে শুধু বাহ্যিকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। “the transsexual surgical operation is so superficial and external that it does not change the personality. If the person was a male, he remains male. If she was female, she remains female.” খ্রিস্টান ধর্মে একজন ইথিওপিয়ান ইনুখ সম্পর্কে আলোচনার কথা আছে। বিবাহ এবং তালাক নিয়ে উত্তর দেওয়ার সময় জিশু এক পর্যায়ে বলেন, “কিছু মানুষ আছে যারা জন্ম থেকে ইনুখ এবং আরও কিছু মানুষ আছে যাদেরকে অন্যেরা ইনুখ বানিয়েছে এবং আরও এক প্রকৃতির মানুষ আছে যারা স্বর্গরাজ্যের জন্য নিজেদেরকেই ইনুখ বানিয়েছে।”

বৌদ্ধ ধর্মে হিজড়া : অধিকাংশ বৌদ্ধলিপিতে ধর্ম প্রতিপালনে কোনো লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন করা হয়নি। নির্বাণ লাভের জন্য কামনাকে এই শাস্ত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। থাই বৌদ্ধধর্মে ‘কতি’ বলে একটি শব্দ আছে। মেয়েদের মতো আচরণকারী পুরুষকে ‘কতি’ বলা হয়। এটা সেখানে পুরুষ সমকামীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। থাইল্যান্ডে কতিদের বিবাহের অনুমতি নেই। তারা কখনোই বিয়ে করতে পারবে না। থাইল্যান্ডে কতিদের নারীতে রুপান্তরিত হওয়া কি পুরুষ বিয়ে করা এখনও আইনত অবৈধ। কিন্তু হিজড়া মহিলারা তাদের ইউরোপীয় সঙ্গীকে বিয়ে করতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে তাকে থাইল্যান্ড ত্যাগ করে তাদের সঙ্গীদের দেশে চলে যেতে হবে।

ইহুদি ধর্মে হিজড়া : মোজেস বা হজরত মুসার অনুসারীদেরকে বলা হয় ইহুদি। ইহুদি ধর্মে হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডারদের “সারিস” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিব্রু ‘সারিস’ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে “Eunuch” অথবা “Chamberlain” নামে। ‘তনখ’-এ সারিস শব্দটি ৪৫ বার পাওয়া যায়। সারিস বলতে একজন লিঙ্গ নিরপেক্ষ বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি শক্তিমানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ঈশ্বর সারিসদের কাছে এই বলে প্রতিজ্ঞা করছেন, “তারা যদি সাবাথ পালন করে এবং রোজা রাখে তাহলে তাদের জন্য স্বর্গে একটি উত্তম মনুমেন্ট তৈরি করবেন।” (ইসাইয়াহ, ৫৬)। “তোরাহ”-তে ক্রস ড্রেসিং (যেমন পুরুষের নারীর মতো পোশাক পরা) এবং জেনিটাল বা শুক্রাশয় ক্ষতিগ্রস্ত করার ব্যাপারে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। সেজন্য অনেক ইহুদি হিজড়াদের ধর্মের বাইরের মানুষ মনে করেন। কারণ হিজড়ারা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে হিজড়ারা তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী অথবা পুরুষে নিজেদের রূপান্তর করে নিতে পারবেন। ইহুদিধর্মের অনেক শাখা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানালেও জুদাইজমের সকল ধারা এই রূপান্তরকামিতাকে এখনও সমর্থন করেনি।

বাহাই ধর্মে হিজড়া : বাহাই ধর্মবিশ্বাসে হিজড়াদেরকে Sex Reassignment Surgery (SRS) এর মাধ্যমে একটি লিঙ্গ বেছে নিতে হবে এবং শল্যচিকিৎসকের মাধ্যমে লিঙ্গ রূপান্তর করতে হবে। এসআরএসের পরে তাদেরকে রূপান্তরিত বলে গণ্য করা হবে এবং তারা উপযুক্ত সঙ্গী নির্বাচন করে বাহাই মতে বিবাহ করতে পারবে।

তবে সমকামীদের ভূগোল দেখার আগে একটু ইতিহাস দেখে নেওয়া যাক। প্রাচীন যুগে হেরোডোটাস, প্লেটো, অ্যাথেনেউস, জেনোফোন এবং অন্যান্য লেখকদের লেখা থেকে প্রাচীন গ্রিসে সমকামিতা প্রসঙ্গে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। জানা যা প্রাচীন গ্রিসে বহুল প্রচলিত ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমকামী যৌন সম্পর্কটি ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও সদ্যকিশোর বা পূর্ণকিশোর বালকদের মধ্যেকার যৌন সম্পর্ক (প্রাচীন গ্রিসের বিবাহপ্রথাও ছিল বয়সভিত্তিক; তিরিশ বছর পার করা পুরুষেরা সদ্যকিশোরীদের বিয়ে করত।)। নারীর সমকামিতার বিষয়টি প্রাচীন গ্রিসে ঠিক কী চোখে দেখা হত, তা স্পষ্ট নয়। তবে নারী সমকামিতাও যে স্যাফোর যুগ থেকে গ্রিসে প্রচলিত ছিল, তা জানা যায়। বিগত শতাব্দীতে পাশ্চাত্য সমাজে যৌনপ্রবৃত্তিকে যেমন সামাজিক পরিচিতির মাপকাঠি হিসাবে দেখা হলেও, প্রাচীন গ্রিসে তেমনটা হত না। গ্রিক সমাজে যৌন কামনা বা আচরণকে সংগমকারীদের লিঙ্গ অনুযায়ী ভাগ করে দেখা হত না; দেখা হত যৌনক্রিয়ার সময় সংগমকারীরা কে নিজের পুরুষাঙ্গ সঙ্গীর দেহে প্রবেশ করাচ্ছে, বা সঙ্গীর পুরুষাঙ্গ নিজের শরীরে গ্রহণ করছে, তার ভিত্তিতে। এই দাতা/গ্রহীতা বিভেদটি সামাজিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্বকারী ও শাসিতের ভূমিকা নিত: অপরের শরীরে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করানো পৌরুষ, উচ্চ সামাজিক মর্যাদা ও প্রাপ্তবয়স্কতার প্রতীক ছিল। অপরদিকে অন্যের পুরুষাঙ্গ নিজের শরীরে গ্রহণ করা ছিল নারীত্ব, নিম্ন সামাজিক মর্যাদা ও অপ্রাপ্তবয়স্কতার প্রতীক।

প্রাচীন গ্রিসের সংস্কৃতিতে প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে গভীর প্রণয় সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায় “ইলিয়াড” মহাকাব্যে। হোমার অ্যাকিলিস ও প্যাট্রোক্ল্যাসের সম্পর্কটিকে যৌন সম্পর্ক বলেননি। চিত্রকলা ও পাত্রচিত্রে প্যাট্রোক্লাসের দাড়ি আঁকা হত। অপরদিকে গ্রিক সমাজে অ্যাকিলিসের স্থান দেবতুল্য হলেও তাঁর চিত্র উলঙ্গই আঁকা হত। এর ফলে কে “এরাস্টেস” এবং কে “এরোমেনোস” ছিলেন, তাই নিয়ে মতানৈক্য দেখা যায়। হোমারীয় ঐতিহ্যে প্যাট্রোক্ল্যাস ছিলেন বয়সে বড়ো; কিন্তু অ্যাকিলিস ছিলেন বেশি শক্তিশালী। অন্যান্য প্রাচীন গল্পের মতে, অ্যাকিলিস ও প্যাট্রোক্ল্যাস ছিলেন নিছক বন্ধু। ঐতিহাসিক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ প্রণয়ীযুগলের মধ্যে এথেন্সের পাউসানিয়াস ও ট্র্যাজিক কবি আগাথন বিখ্যাত। আগাথনের বয়স ছিল ত্রিশের বেশি। মহামতি আলেকজান্ডার ও তাঁর বাল্যবন্ধু হেফাস্টনের সম্পর্কও একই ধরনের ছিল বলে মনে করা হয়।

স্যাফো নারী ও বালিকাদের উদ্দেশ্য করে অনেকগুলি কবিতা রচনা করেছিলেন। ইনি লেসবোস দ্বীপের বাসিন্দা। স্যাফো সম্ভবত ১২,০০০ লাইনের কবিতা লিখেছিলেন নারীদের জন্য। তবে তার মধ্যে মাত্র ৬০০ লাইনরই সন্ধান পেলে। তাই স্যাফো প্রাচীনকালের নারী-সমকামী কবি হিসাবে পরিচিত। তিনি গ্রিক সমাজে “থিয়াসোস” বা অল্পশিক্ষিতা নারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেযুগের সমাজে নারীজাতির মধ্যেও সমকামিতার প্রচলন ছিল। নগররাষ্ট্রের উদ্ভবের পর বিবাহপ্রথা সমাজ ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে ওঠে এবং মেয়েরা গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। “থিয়াসোস”-রা হারিয়ে যায়। স্যাফোর জন্মস্থান লেসবস থেকেই তো অভিধানে জায়গা পেয়েছে লেসবিয়ান শব্দটি। সামাজিকভাবে নারীর সমকামিতার কোনো স্থান হয়নি। সাধারণ ভাবে নারীর সমকামিতার ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্য বেশি নেই।

সমকামী বিষয়বস্তু সম্পর্কে দীর্ঘকাল নীরব থাকার পর ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন। এরিক বেথে ১৯০৭ সালে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। পরে কে. জি. ডোভারাও গবেষণা চালিয়ে যান। গবেষণায় জানা গেছে, প্রাচীন গ্রিসে সমকামিতার খোলাখুলি প্রচলন ছিল। এমনকি সরকারি অনুমোদনও ছিল। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে রোমান যুগ পর্যন্ত এই অবস্থা চলেছিল। কোনো কোনো গবেষকদের মতে সমকামী সম্পর্ক, বিশেষত পেডেরাস্টির প্রচলন ছিল উচ্চবিত্ত সমাজের মধ্যেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রথার প্রচলন খুব একটা ছিল না। ব্রুস থর্নটনের মতে, অ্যারিস্টোফেনিসের কৌতুক নাটকগুলিতে গ্রহীতার স্থান গ্রহণকারী সমকামীদের প্রতি উপহাস করার প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, পুরুষ সমকামিতাকে সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখত না। ভিক্টোরিয়া ওল প্রমুখ অন্যান্য ঐতিহাসিকেরা বলেছেন, এথেন্সে সমকামী সম্পর্ক ছিল “গণতন্ত্রের যৌন আদর্শ”। এটি উচবিত্ত ও সাধারণ মানুষ — উভয় সমাজেই সমাজভাবে প্রচলিত ছিল। হার্মোডিয়াস ও অ্যারিস্টোগেইটন নামে দুই হত্যাকারীর ঘটনা থেকে তা প্রমাণিত হয়। এমনকি যাঁরা বলেন যে, পেডেরাস্টি উচ্চবিত্ত সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল, তাঁরাও মনে করেন যে এটি ছিল “নগররাষ্ট্রের সামাজিক কাঠামোর অঙ্গ”।

আধুনিক গ্রিসে এই বিষয়ে বিতর্ক হয়েছে। ২০০২ সালে মহামতি আলেকজান্ডার সম্পর্কিত এক সম্মেলনে তাঁর সমকামিতা নিয়ে বিতর্ক হয়। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “আলেকজান্ডার” চলচ্চিত্রে আলেকজান্ডারকে উভকামী হিসাবে দেখানোর জন্য ২৫ জন গ্রিক আইনজীবী চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে ছবির এক আগাম প্রদর্শনীর পর তাঁরা আর মামলা করেননি।

দীপা মেহতার ‘ফায়ার’ বা মধুর ভাণ্ডারকারের ‘পেজ থ্রি’ ছাড়াও সমকালে ভারতীয় সিনেমাতে সমলিঙ্গ প্রেমের প্রচুর উদাহরণ আছে। সদ্যপ্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চিত্রাঙ্গদা’, কিংবা ‘তিনকন্যা’, মৈনাকের ‘ফ্যামিলি অ্যালবাম’, অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’ ‘তাসের দেশ’-এর মতো হাল আমলের নানা বাংলা ছবির গল্পও ঘিরেছে সমকামী সম্পর্ক। লক্ষ করা গেছে আদিকাল থেকে শিল্প-সাহিত্যেও মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অভিলাষ সমকামিতার প্রতিফলন। অথচ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদালতের রায়ে সহস্রাব্দ প্রাচীন সমকাম আজ বিকৃত সমকামিতা অপরাধ। গ্রিক সভ্যতা থেকে প্রাচীন ভারত। আধুনিক সাহিত্য-সিনেমাতেও বারবার জায়গা করে নিয়েছে সমকামী মানুষের গল্প। প্রাচীন নাগরিক সমাজ, ব্যক্তির স্বাধীনতা, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা যেখানে জন্ম নিয়েছিল গ্রিসে। সেই গ্রিস, যে কখনও নাগরিকের যৌন স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। সমলিঙ্গ যৌন সংসর্গের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না সেখানে। হেরোডেটাস, প্লেটোর মতো দার্শনিক-চিন্তাবিদদের লেখায় প্রায়ই পাওয়া যায় সমকামী সম্পর্কের কথা।

ইতিহাস বলছে, প্রাচীন পারস্যে সমকামী সম্পর্কের প্রচলন ছিল। এই ভারতবর্ষেও সমকামিতা ছিল এবং আছে। বহু হিন্দু মন্দিরের দেওয়ালের ভাস্কর্য তো সমকামেরই পরিচয় প্রকট হয়ে আছে। খাজুরাহোর শিল্পকীর্তিতে তো রয়েছে গ্রুপ সেক্সের নিদর্শনও। মহাভারতে বৃহন্নলা আর শিখণ্ডি, পুরাণে বিষ্ণুর মোহিনী রূপ আর অর্ধনারীশ্বর শিব, পুরাণের পাতায় পাতায় যেন তৃতীয় লিঙ্গের সদর্প উপস্থিতি। এমনকী, বাৎসায়নের কামসূত্রও সমকামিতা নিয়ে আলোচিত হয়েছে, দেখানো হয়েছে যৌন সম্পর্কেরই অন্য এক রূপ। এমনকি আধুনিক সাহিত্যেও অনেক লেখক স্বীকৃতি দিয়েছে সমকামিতাকে । অস্কার ওয়াইল্ডের জীবনী লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত এই সমকামী সাহিত্যিকের জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন রিচার্ড এলম্যান।

সমকামীদের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুলভাল ধারণা আছে। যেমন – (১) সমকামিতা পাশ্চাত্যের সৃষ্টি। পাশ্চাত্যের উদার সমাজব্যবস্থা এবং ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমকামিতার জন্য দায়ী। (২) সমকামিতা এক ধরনের মানসিক বিকৃতি বা অসুস্থতা। (৩) সমকামীদের সুশিক্ষা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। (৪) সমকামিতা একটা রোগ। (৫) প্রকৃতিতে অন্য কোনো জীবজন্তু বা গাছপালার মধ্যে সমকামিতা দেখা যায় না। (৬) সমকামীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। (৭) জীবজন্তুরা তো অনেক কিছু করে, তাই বলে সেগুলি মানুষেরও করতে হবে নাকি?

উত্তরে বলি — প্রথমত, সমকামিতা মোটেই পাশ্চাত্যের সৃষ্টি নয়। প্রথমত আদিমকাল থেকেই সমকামিতা আছে। ইতিহাসের বিভিন্ন অংশে সমকামিতার দৃষ্টান্ত আছে। সমকামিতা কোনো ফ্যাশান নয়, এটি একটি যৌন-সংকট। প্রাচীন বিভিন্ন মহাকাব্য সমকামিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আছে। মধ্যপ্রাচ্যে সমকামিতার ব্যাপক প্রচলন ছিল এক সময়ে। আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট, সক্রেটিস সমকামী ছিলেন। কামসুত্রে সমকামিতার প্রচুর উদাহরণ আছে। অতএব সমকাম কোনো পাশ্চাত্যের তৈরি করা বিষয় নয়। দ্বিতীয়ত প্রাণীকুলে সমকামিতার ব্যাপক বিস্তার দেখতে পাওয়া যায়। প্রাণীকুল পাশ্চাত্যের উদার জীবনব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়েছে এটা যারা ভাবে তাদের সম্পর্কে বলার কিছু নেই।

দ্বিতীয়ত, সমকামিতা কোনোভাবেই মানসিক বিকৃতি নয়। কিন্তু জীববিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, সমকাম কোনো মানসিক বিকার নয়। এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিষয়। প্রত্যেক জীবের মধ্যে কিছু অংশ অবশ্যই সমকামী হয়ে জন্ম নেবে। তারা বেড়ে ঊঠবে সমকামী হয়ে, তাদের চালচলনে সমকামী ভাব ফুটে ঊঠবে। একটা রক্ষণশীল সমাজে সমকামীরা বেঁচে থাকে গোপনে, তাদের যৌনপ্রবৃত্তি তারা উপভোগ করে গোপনে, অনেক ক্ষেত্রে অপরাদের মাধ্যমে, আর-একটা মুক্তসমাজে সেটা হয় প্রকাশ্যে। প্রকাশ্যে হওয়ার কারণে অপরাধের মাত্রা কমে যায়। মাদ্রাসার শিক্ষকরা বা ইমামরা যারা সমকামী, তাঁরা তাঁদের যৌন আকাঙ্ক্ষা মেটায় অপরাধের মাধ্যমে। হয়তো তারা একজন নারীর সঙ্গে বিবাহত জীবন পালন করছে, কিন্তু তৃপ্তির অভাবে তারা প্রতিনিয়ত সুযোগ খোঁজে তাদের অবদমিত কামনা পুরণের। যার শিকার সব সময় আমাদের দেশের বালক-তরুণরা হয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বে সমকামীরা প্রকাশ্যে বলে যে তারা সমকামী। যার ফলে চিনতে পারা সহজ হয় এবং সমলিঙ্গের Straight মানুষরা সবসময় সতর্ক থাকতে পারে। তার উপর সমকামীরা সমকামী সঙ্গী বেছে নিয়ে স্বাভাবিক বিবাহিত এবং যৌন জীবনযাপন করলে তারা অপরাধের মাধ্যমে তাদের যৌনাকাঙ্ক্ষা পূরণ করার প্রয়োজন পড়ে না।

তৃতীয়ত, সমকামীদের নিয়ে যেই মামলাগুলি হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছিল যে সমকামীরা বিকৃতির শিকার কিংবা রোগী বা কিংবা অসুস্থ। কিন্তু মেডিকেল সায়েন্সে straight-দের সঙ্গে সমকামীদের কোনো পার্থক্য আছে, শারীরিক বা মানসিকভাবে, তার কোনো প্রমাণ নেই। তাহলে সমকামীরা অসুস্থ বা মানসিক বিকৃতির শিকার বা বিকলাঙ্গ তাও বলা যাচ্ছে না।

চতুর্থত, প্রকৃতিতে বিভিন্নভাবে কীভাবে সমকামিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রকৃতির সৃষ্ট প্রায় প্রতিটি প্রাণী এবং বৃক্ষরাজিতে সমকামিতা বিদ্যমান। বেশিরভাগ জীব এবং গাছপালায় সমকামিতার প্রকাশ আছে।

ষষ্ঠত, সমকামীদের কেন সামাজিকভাবে বয়কট করার কথা বলা হবে ? তারা রক্তমাংসের মানুষ। একজন সমকামী পুরুষের নারীর প্রতি প্রাকৃতিকভাবে আকর্ষণ বোধ করে না। কোনো নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নারী দেখলে তার লিঙ্গ উত্থিত হয় না। সেই পুরুষের লিঙ্গ উত্থিত হবে কোনো নগ্ন বা অর্ধ নগ্ন পুরুষ দেখলে। একইভাবে নারী সমকামীরও কোনো নগ্ন নারী দেখলে উত্তেজনা আসবে, অপরদিকে পুরুষদের দেখে তাকে যৌনসঙ্গী করার কোনো ইচ্ছাই জাগবে না। এই কারণে নিশ্চয়ই একজন মানুষকে একঘরে করে রাখা বা বয়কট করা কোনোমতেই মানবিক আচরণ হতে পারে না। এটা অন্যায্য, ব্যক্তি-স্বাধীনতায় নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ।

সপ্তমত, জীবজন্তুরা এমন অনেক কাজ করে যেটা সভ্য মানুষের করা উচিত নয়, এটা ঠিক । যেমন ধর্ষণ প্রবৃত্তি জীবকুলে বিদ্যমান, পিতামাতার সঙ্গে যৌনতা প্রাণীকুলে বিদ্যমান। একজন সভ্য মানুষ কখনোই এই ধরনের কাজ করতে বা সমর্থন করতে পারে না। কথা হচ্ছে সমকামিতাও কি একই ধরনের ব্যাপার ?

সমকামিতা সমকামীরা নিজে নির্ধারণ করে না। প্রকৃতি তাদের ভিতরে সমকামিতার বীজ বপন করে। একজন ধর্ষক ধর্ষণ না-করেও সুস্থ্ যৌনতার মাধ্যমে নিজের যৌনাকাঙ্ক্ষা পুরণ করতে পারে। একজন ইনসেস্টার বা অজাচারিতা ইনসেস্ট বা অজাচার সম্পর্ক না-করেও সুস্থ যৌনজ়ীবন যাপন করতে পারে।

হিজড়ে এবং সমকামীরা কি একই সমগোত্রীয় ? সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘অন্তহীন অন্তরীণ প্রোষিতভর্তৃকা’ গ্রন্থে বিষয়টা পরিষ্কার করেছেন। তিনি হিজরানী শ্যামলী-মায়ের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন – “এতদিনে মানুষের ধারণা ছিল হিজড়ে বুঝি জন্ম থেকেই হয়। ছোটোবেলাতেই হিজড়ে সন্তান জন্মালে মা-বাবা তাকে হিজড়ে ডেরায় দিয়ে আসে। কেন – এমন গল্প শুনিসনি, হিজড়ে বাচ্ছাকে মা-বাবা আটকে রেখেছিল, পাড়ায় হিজড়েরা তালি দিচ্ছিল, আর সেই তালি শুনে ঘর থেকে বাচ্ছা হিজড়ে তালি দিল। আর সেই তালি শুনে হিজড়েরা বাচ্ছাটাকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেল !”

হিজড়া হতে হলে লিকম্ (লিঙ্গ) ছিবড়াতে (কর্তন) হয়।অণ্ডকোশ সমেত পুরুষাঙ্গ কেটে ফেললে তবেই ‘নির্বাণ’ বা প্রকৃত সন্মানিত হিজড়া হওয়া যায়।অবশ্য পুরুষাঙ্গ কর্তন করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পুরুষাঙ্গ নিয়ে যে ধুরানি (বেশ্যা বা যৌনকর্মী) হিজড়া বৃত্তি করবে তাকে হিজড়ারা ‘আকুয়া’ (বিপরীত সাজসজ্জাকামী ও যৌনপরিবর্তনকামী) বলে।

ওরা ঢোল বাজিয়ের দল, ওরা হিজড়া। ওরা নবজাতকের খোঁজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, ওরা হিজড়া। ওরা এক শ্রেণির অবাঞ্ছিত অপাঙক্তেয় মানবগোষ্ঠী, ওরা হিজড়া। ওরা যৌন বিকলাঙ্গ – এক প্রতিবন্ধী মানুষ, ওরা হিজড়া। মনুষ্য সমাজে এক অন্তঃসলিলা প্রবাহ, যাঁরা প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে চলে আসছে সমাজের উত্থানপতন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, ওরা হিজড়াই। প্রাণীজগতে আমরা চার প্রকারের উভলিঙ্গত্ব দেখতে পাই। (১) প্রকৃত হিজড়া (True Hermaphrolite), (২) পুরুষ অপ্রকৃত হিজড়া (Male Pseudo Hermaphrodite), (৩) স্ত্রী অপ্রকৃত হিজড়া (Female Pseudo Hermaphrodite) এবং (৪) ফ্রিমার্টিন সিনড্রোম (Freemartin Syndrome)।প্রকৃত হিজড়াদের ক্ষেত্রে একই দেহে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়ের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। পুরুষ অপ্রকৃত হিজড়াদের শরীরের আপাত বাহ্যিক গঠন মেয়েলি হলেও শুক্রাশয় বর্তমান। স্ত্রী অপ্রকৃত হিজড়াদের দৈহিক গঠনের সঙ্গে সুস্থ পুরুষের আপাত সাদৃশ্য থাকলেও এরকম হিজড়ার দেহে ডিম্বাশয় থাকে।

হিজড়াদের মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায় – (১) জন্মগত হিজড়ে এবং (২) ছদ্মবেশী হিজড়া।

() জন্মগত হিজড়ে : আমরা আমাদের চারপাশে যেসব হিজড়া দেখি তাদের অনেকেই জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী। এদের যৌন জনন বৈকল্য বা প্রতিবন্ধকতা একরকম নয়। কারোর যৌনাঙ্গ অপুষ্ট বা অপূর্ণাঙ্গ। কারোর-বা শরীরে নারী ও পুরুষ অপরিপূর্ণ যৌনাঙ্গের অবস্থান লক্ষ করা যায়। এখন প্রশ্ন কেন প্রতিবন্ধকতা ?

নারী-পুরুষ লিঙ্গ নির্ধারণ হয় দুই ধরনের আলাদা আলাদা ক্রোমোজোমের উপস্থিতিতে। সাধারণত প্রতি কোশে এক জোড়া ক্রোমোজোম দেখা যায়, যারা বস্তুত লিঙ্গ নির্ধারক। এই ক্রোমোজোমগুলিই হল Sex Chromosome বা যৌন ক্রোমোজোম।যৌন ক্রোমোজোম দুটিকে X এবং Y দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। বাকি ক্রোমোজোমগুলি জীবের অন্যান্য বৈশিষ্ঠ্যের ধারক। এরা Autosome বা অযৌন ক্রোমোজোম।স্বাভাবিক ক্ষেত্রে মানুষের দেহকোশের ক্রোমোজোমের সংখ্যা ৪৬ বা ২৩ জোড়া। এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে এক জোড়া ক্রোমোজোম নির্ধারক। অর্থাৎ বাকি ২২ জোড়া অটোজোম।Y ক্রোমোজোমের আকৃতি ও আয়তনে X ক্রোমোজোমের তুলনায় ক্ষুদ্র। স্ত্রী দেহকোশে দুটি X ক্রোমোজোম থাকে। অপরদিকে, পুরুষ দেহকোশে একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম থাকে। প্রতিটি কন্যা সন্তান মাতাপিতার কাছ থেকে ২২ জোড়া অযৌন ক্রোমোজোম পেয়ে থাকে। এর ম্যধ্যে মায়ের কাছ থেকে একটি X ক্রমোজোম এবং বাবার কাছ থেকে একটি Y ক্রোমোজোম, অর্থাৎ দুটি XX যৌন ক্রোমোজোম পেয়ে থাকে। অপরদিকে পুত্র সন্তানটি ২২ জোড়া অযৌন ক্রোমোজোমের সঙ্গে মায়ের কাছ থেকে একটি X এবং বাবার কাছ থেকে একটি Y ক্রোমোজোম লাভ করে।এটাই স্বাভাবিক হলেও সবসময় তা হয় না। অনেক সময় যৌন ক্রোমোজোমের ত্রুটির ফলে কোনো সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সন্তানটি ছেলে না মেয়ে, সেটা বলা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তখন সে তৃতীয় সেক্সের দলে পড়ে, অর্থাৎ হিজড়া।

ক্রোমোজোম ও বার্বডির ত্রুটির হিসাবে হিজড়াদের ছয় ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন– (১) ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোম, (২) XXY পুরুষ, (৩) XX পুরুষ, (৪) টার্নার সিনড্রোম, (৫) মিশ্র যৌনগ্রন্থির বিকৃতি।

() ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোম (Klinefelter Syndrome): এদের স্ফীত স্তন দেখা যায়। এদের শিশ্ন বা পুংলিঙ্গ থাকে বটে, তবে তা অত্যন্ত ক্ষুদ্র। শুক্রাশয়ও খুব ছোটো হয়। বগল (বাহুমূল) চুল বা কেশ থাকে না। এদের তলপেটের নীচে, অর্থাৎ যৌনাঙ্গের চারপাশে চুল কম হয়। মুখে দাড়ি-গোঁফ কম হয়। এরা সাধারণত উচ্চতায় লম্বা ধরনের হয়ে থাকে। মানসিক জড়তাও থাকতে পারে।এই সমস্ত ব্যক্তিদের দেহকোশে ২২ জোড়া অটোজোম, ২টি X ক্রোমোজোম এবং একটি Y ক্রোমোজোম — মোট ৪৭টি ক্রোমোজোম থাকে। সাধারণ অবস্থায় পুরুষের শরীরে যৌন ক্রোমোজোম থাকে XY এবং মোট ক্রোমোজোমের সংখ্যা হয় ৪৬টি। অতিরিক্ত স্ত্রী যৌন ক্রোমোজোম, অর্থাৎ X-এর উপস্থিতির ফলেই ব্যক্তির শরীরে স্ত্রী-বৈশিষ্ট্য প্রকট হয়।

() XXY পুরুষ (XXY Male) : এদের শরীরের গঠন পুরুষদের মতো হলেও এরা পুরোপুরি পুরুষ নয়।এরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা হয়। এদের বুদ্ধিবৃত্তি কম। এদের মধ্যে অনেক সময়েই হিংসাত্মক সমাজবিরোধী আচরণের প্রকাশ ঘটে।পুরুষদের মতো লিঙ্গ থাকে।তবে লিঙ্গ থাকলেও মূত্রছিদ্রটি লিঙ্গের স্বাভাবিক স্থানে না। এদের অণ্ডকোশও স্বাভাবিক স্থানে না। থাকে শরীরের অভ্যন্তরে।এদের শরীরে ক্রোমোজোমের সংখ্যা ৪৭।৪৪ টি অটোজোম এবং ৩ টি যৌন ক্রোমোজোম। যৌন ক্রোমোজোমের মধ্যে একটি X এবং দুটি Y ক্রোমোজোম থাকে।

() XX পুরুষ (XX Male Syndrome) : XX-পুরুষদের সঙ্গে ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোমের অনেক মিল আছে। এদের অনেকেরই স্তন থাকে। তবে তা কখনোই সুডৌল এবং স্ফীত নয়।শুক্রাশয় থাকে, তবে তা খুবই ক্ষুদ্র। তবে শুক্রাশয় থাকলেও সেখানে শুক্রাণু উৎপন্ন হয় না।পুরুষাঙ্গ আকৃতিতে স্বাভাবিক, অথবা স্বাভাবিকের তুলনায় ছোটোও হতে পারে। লিঙ্গের যে স্থানে মূত্রছিদ্রটি থাকার কথা সেখানে থাকে না। XX-পুরুষরা উচ্চতায় বেঁটে প্রকৃতির হয়।এই ধরনের XX-পুরুষের শরীরে ক্রোমোজোমের মোট সংখ্যা ৪৮। অটোজোম ৪৬ টি এবং দুটি সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। XX সেক্স ক্রোমোজোমের উপস্থিতি থাকলেও ক্রোমোজোমের গঠনের অস্বাভাবিকতার জন্য এরা পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে পারে না।বিভিন্ন রকম পুরুষালি ভাব প্রকট হয়।

() টার্নার সিনড্রোম (Turner Syndrome) : এদের ক্রোমোজোমের গঠন ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোম ও XX-পুরুষ হিজড়াদের অনুরূপ নয়। আপাতদৃষ্টিতে এদের নারী মনে হলেও এরা কিন্তু পুরোপুরি নারী নন। কারণ এদের প্রধান যৌনাঙ্গ এবং অন্যান্য গৌণ যৌনাঙ্গ ত্রুটিযুক্ত। এদের যৌনাঙ্গের সঙ্গে নারীর যৌনাঙ্গের আপাত সাদৃশ্য থাকে। যোনিকেশ খুবই কম দেখা যায়। ডিম্বাশয় থাকে না এবং অপূর্ণাঙ্গ ফেলোপিয়ান টিউব ও জরায়ুর গঠন। এর ফলে রজঃস্বলা বা পিরিয়ড হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এদের বুকের ছাতি পুরুষদের মতো প্রশস্ত। তবে এদের প্রশস্ত ছাতিতে কৈশোর থেকে স্তনগ্রন্থির প্রকাশ ঘটে। এরা অস্বাভাবিক খর্বাকৃতি হয়। গায়ের চামড়া টানলে অনেকটা ঝুলে পড়ে। হাত-পায়ের অত্যন্ত খসখসে হয়।এদের বৌদ্ধিক ক্ষমতা সাধারণের চাইতে কম।এদের কোশের ক্রোমোজোমের সংখ্যা ৪৫ (অটোজোম ৪৪ + X)।বার্বোডি থাকে না। ক্রোমোজোমের এই অস্বাভাবিকতার জন্যেই এদের যৌনাঙ্গ ইত্যাদি ত্রুটিযুক্ত হয়। Y ক্রোমোজোমের অনুপস্থিতি যেমন শরীরে পুরুষালি ভাব প্রকাশের অন্তরায় হয়ে শরীরকে নারীসুলভ করে তোলে, ঠিক তেমনই বার্বোডি না-থাকায় নারী শরীরের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। দেহের গঠন আংশিক পুরুষের মতো হয়ে থাকে।

() মিশ্র যৌনগ্রন্থির বিকৃতি (Mixed Gonadal Dysgenesis) : আপাতদৃষ্টিতে এদের পুরুষ বলেই মনে হয়। গোঁফ-দাড়িও হয়। শুক্রাশয় থাকে, তবে তা থাকে শরীরের অভ্যন্তরে। এই প্রকার হিজড়াদের শুক্রাশয়ের বিভিন্ন প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যই পরিণত শুক্রাণুর জন্ম হয় না। এদের শিশ্ন বা লিঙ্গ বর্তমান থাকে। মূত্রছিদ্র লিঙ্গের স্বাভাবিক স্থানেই থাকে।ব্যতিক্রম যেটা, সেটা হল লিঙ্গ থাকা সত্ত্বেও এদের শরীরে যোনি অর্থাৎ স্ত্রীযোনি, জরায়ু এবং ফেলোপিয়ান টিউব থাকে। কৈশোরের এদের শুক্রাশয় থেকে এন্ড্রোজেন নিঃসৃত হয়, ফলে শরীরে পুরুষালি ভাব বেশ প্রকট হয়ে ওঠে।প্রধানত ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা, অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডের নানারকম ত্রুটি এবং জননকোশের উৎপত্তি স্থানের নানা সূক্ষ্ম জটিলতার ফলেই এমন যৌনবিকলাঙ্গ মানুষের জন্ম হয়। এইসব মানুষদের দেহকোশে ক্রোমোজোমের সংখ্যা সাধারণত ৪৬ (৪৫ + X) হয়। অবশ্য অনেক সময়েই ৪৭ (৪৫ + XY)ও দেখা যায়।

হিজড়াদের দলে জন্মগত যৌন-প্রতিবন্ধীর সংখ্যা খুবই নগণ্য। সামান্য কিছু ব্যতীত প্রায় সকলেই ছদ্মবেশী হিজড়া।তবে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে এরা এত বেশি অসুস্থ যে খোশমেজাজে নেচে-গেয়ে হিজড়াদের দলে থেকে এদের জীবন াটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। নানাবিধ শারীরিক পীড়ায় জর্জরিত এরা।আর পাঁচটা অসুস্থ-পঙ্গু মানুষের মতো এরা সংসারের বোঝা। তাই সম্প্রদায়ভুক্ত হিজড়াদের দলে এদের ঠাঁই হয় না। এদের কাছেও এরা ঝঞ্ঝাট। অন্যভাবে বললে এরা “অপ্রকৃত হিজড়া”।প্রসঙ্গত জানাই, যৌন-প্রতিবন্ধী যাঁরা তাঁদেরকে “প্রকৃত হিজড়া” বলা হয়।প্রকৃত হিজড়াদের সকলকেই পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব না-হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যানে অনেকেই ত্রুটিমু্ক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।যদিও ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা থাকলে তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনা যায় না ঠিকই, কি্তু হাইপোস্পিডিয়াস থাকলে তাকে সার্জারির সাহায্যে ভালো করে তোলা সম্ভব হয়। টানার্স সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আগামীদিনে জন্মগত হিজড়ে অনেক কমে যাবে।

() ছদ্মবেশী হিজড়া : ছদ্মবেশী হিজড়াদের চারভাগে ভাগ করলে আলোচনার সুবিধা হবে। যেমন – (ক) আকুয়া, (খ) জেনানা, (গ) ছিবড়ি এবং (ঘ) ছিন্নি।

() আকুয়া : হিজড়া দলে এক ধরনের পুরুষ থাকে যাঁরা মেয়ে সাজতে চায়, মেয়ে হতে চায়।মেয়ে হিসাবে নিজেকে জাহির করার মধ্যে এঁরা অসম্ভব রকম মানসিক পরিতৃপ্তি বোধ করে।এঁরা পুরুষ হলেও নারী-বেশ ধারণ করতে পছন্দ করে। স্রেফ এক বিশেষ মানসিক তাড়নায় এরা মেয়ে সেজে থাকতে চায়। সদ্য শৈশব পেরিয়ে আসা কিশোরদের মধ্যে এরকম ভাব লক্ষ করা যায়। তবে পরিণত বয়সেও কোনো পুরুষের মধ্যেও এ ধরনের মানসিকতা সৃষ্টি হতে পারে।মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এদের মানসিকতাকে Transexualism বা লিঙ্গরূপান্তরকামিতা বা যৌন পরিবর্তনকামিতা বলে।নিজেকে পুরোপুরি পালটে মহিলা হিসাবে পরিচিত হতে চায়।যৌন পরিবর্তনকামী মানুষরা নারীত্বের স্বাদ পেতে চায়। পুরুষদের এরা প্রেমিকা ভাবে।কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজের সদ্য নিযুক্ত মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন আগে পর্যন্তও ‘আকুয়া’ সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাবে পরিচিত ছিলেন। আজ বিজ্ঞানের কল্যানে ‘পুরুষ’ সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে ‘নারী’ হিসাবে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুনর্জন্ম হয়েছে।

এই আকুয়ারা সমবয়সিকে স্রেফ বন্ধু হিসাবে পেতে চায়, যৌনসঙ্গী হিসাবে নয়।কিন্তু পুরুষ হয়েও মেয়েলি স্বভাব ও আচরণের জন্য মেয়েরা তাঁদের মেয়ে হিসাবে মেনে নিতে পারে না। মেয়েলি ভাবের জন্য এরা যেমন মেয়েদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়, তেমনি পুরুষদের কাছ থেকেও প্রত্যাখ্যাত হয়।ফলে এদের ম্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অন্তর্মুখীনতা দেখা যায়। দারিদ্র্য, সাংসারিক আর পারিপার্শ্বিক চাপে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা আকুয়ারা একটা সময় হিজড়াদের দলে এসে ভিড়ে যায়। সবার ভাগ্যে তো আর মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ঘর ও বর জোটে না !

() জেনানা : জেনানা হল নারীর সাজে সজ্জিত কোনো পুরুষ। তবে এদের আকুয়া বলা যাবে না। কারণ জেনানারা কোনো বিশেষ মানসিকতার দ্বারা আক্রান্ত নয়। নারী বেশ ধারণের মধ্য দিয়ে এরা কোনো সুখ উপলব্ধি করে না। যৌন-প্রতিবন্ধী হিসাবে পরিচিত হয়ে এরা সমাজের কাছ থেকে সর্বপ্রকার বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে চায়। কম খেটে অসদুপায়ে বেশি রোজগারের আশায় জেনানা হিজড়াদের এই ধরনের নারীবেশ ধারণ। হিজড়ার জগতে জেনানাদের দাপটই সবচেয়ে জেনানারা আবার দু-ধরনের হয়। যেমন – (অ) যৌনক্ষমতাহীন জেনানা এবং (আ) যৌনক্ষমতাসম্পন্ন জেনানা।

() যৌনক্ষমতাহীন জেনানা : হিজড়া দলের এইসব জেনানারা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমাজের এক্কেবারে পিছিয়ে-পড়া শ্রেণির মানুষ। অস্বাস্হ্যকর ঝুপড়ি-বস্তি এলাকা থেকেই এইসব হিজড়ারা সংগৃহীত হয়। এদের কেউ কেউ অনাথ। এরা স্বেচ্ছায় হিজড়াদের দলে চলে আসে। দারিদ্র্য, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং অল্প পরিশ্রমে রোজগারের হাতছানি যৌনক্ষমতাহীন ব্যক্তিদের হিজড়াদের ডেরায় ভিড়ে যায়।

() যৌনক্ষমতাসম্পন্ন জেনানা : এরা শরীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে পরিপূর্ণ সুস্থ পুরুষমানুষ। এরা ধান্দাবাজ, ধুরন্ধর। এদের অনেকেরই স্ত্রী-সন্তান-পরিবার থাকে। কোনো জেনানা যদি হিজড়েদের দলের প্রধান হয় তাহলে তার পক্ষে তার পরিবারের সঙ্গে থাকা সম্ভব হয় না। দল পরিচালনার জন্যে তাকে হিজড়া-মহল্লাতেই থাকতে হয়। তাই বলে পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নষ্ট হয় না। সেই কারণেই এদেরকে রোজ ভোর হতে না-হতেই ছুটতে হয় হিজড়েদের দুনিয়াতে।

() ছিবড়ি : শুধু পুরুষরাই নয়, হিজড়াদের দলে কিছু মহিলাদেরও দেখা যায়। এইসব হিজড়াদের ছিবড়ি বলা হয়। এরা যৌনাঙ্গের ত্রুটিযুক্ত মহিলা নয়, সুস্থ-সবল মানুষ এরা। নিতান্তই অর্থনৈতিক কারণেই এরা হিজড়ের দলে এসে যোগ দেয়। চরমতম আর্থিক সংকটের মধ্যেই দিন গুজরান করে। রুটিরুজির ধান্দায় এরা হিজড়াদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। হিজড়াদের সঙ্গে থাকার কারণে এরা হিজড়াদের আদব-কায়দা শিখে নেয়। রপ্ত করে নেয় হিজড়া সমাজের রীতিনীতি। এরা বেশিরভাই বিবাহিতা এবং স্বামী পরিত্যক্তা হন।

() ছিন্নি : যে সমস্ত ব্যক্তি লিঙ্গ কর্তন করে ‘খোজা’ হয়, তাদেরকেই ‘ছিন্নি’ বলে।হিজড়াদের গরিষ্ঠাংশই ছিন্নি। আকুয়া থেকে অনেকে হিজরাই স্বেচ্ছায় ছিন্নিতে রূপান্তরিত হয়। যৌন পরির্তনকামী হিজড়ারা নিজেদের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে। শরীর থেকে পুরুষাঙ্গ কর্তন করে পরিপূর্ণ নারী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে। আধুনিক বা অগ্রসর দেশগুলিতে অত্যাধুনিক প্ল্যাস্টিক সার্জারি করে যৌন পরিবর্তনকামীরা তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করার সুযোগ পেতে পারে। এই জাতীয় অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই এ স্বপ্ন অধুরাই থেকে যায়। তবে যারা অসম্ভব রকমের মানসিক টানাপোড়েনকে উপেক্ষা করতে পারেন না, তারা হাতুড়ে চিকিৎসক দিয়ে লিঙ্গ কর্তন করিয়ে নেয়। অবশ্য যৌন পরিবর্তনকামী আকুয়ারা ছাড়াও যৌনক্ষমতাহীন জেনানারাও অনেক সময় তাদের লিঙ্গ কর্তন করায়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দালাল মারফত পুরুষ-শিশু, কিশোর এবং যুবকদের হিজড়াদের গোষ্ঠীপতিরা সংগ্রহ করে। এরপর ওদের লিঙ্গ কর্তন বা খোজা করে ‘পাকা হিজড়া’ বানিয়ে তাদের বিভিন্ন রকম রোজগারের কাজে নামানো হয়।

খোজার কথা যখন উঠলই তখন আমরা জেনে নিতে পারি খোজার ইতিহাস।কীভাবে ‘খোজা’ (ক্যাসট্রেশন) করা হয় তাও জানব। খোজাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষের হাতে গড়া খোজাদের আবির্ভাব হয়েছিল মেসোপটেমিয়ায়। খোজা  প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজকীয় হারেমে বা জেনানামহলে কর্মী ও কর্মকর্তা হিসাবে নিযুক্ত খোজাকৃত পুরুষ। বিশেষ উদ্দেশ্যে পুরুষদের খোজা করার প্রথা খ্রিস্টপূর্ব আট শতকের গোড়ার দিকেও প্রচলিত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে খোজারা রাজকীয় হারেমের ভৃত্য বা প্রহরী হিসাবে, খেতাবধারী বা বৃত্তিভোগী রানি এবং সরকারের যোদ্ধা ও মন্ত্রীদের পরামর্শদাতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এ প্রথা বা ব্যবস্থাটি ভারতে প্রবর্তিত হয় সম্ভবত সুলতানি আমলের গোড়ার দিকে। খোজাদের প্রধানত সুলতানদের প্রাসাদে হারেম প্রহরার জন্য নিযুক্ত করা হলেও চিনা খোজাদের মতো সুলতানি আমলের খোজারা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা পালন করে। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির (১২৯৬-১৩১৬) অন্যতম বিখ্যাত সেনাপতি ও ওয়াজির মালিক কাফুর একজন খোজা ছিলেন। দিল্লির খোজাদের মতো বাংলার অভিজাতবর্গের খোজারাও প্রশাসনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। বাংলায় হাবশি শাসনামলে (১৪৮৭-১৪৯৩) বস্তত শাসকদের ক্ষমতার উত্থান-পতনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শাহজাদা ওরফে বারবক নামে এক খোজা ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মসনদ দখল করেন। পণ্ডিতদের বিশ্বাস, হাবসি সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৩) খোজা ছিলেন। সমসাময়িক বাংলায় পর্তুগিজ পরিব্রাজক দুয়ার্তে বারবোসার বিবরণ অনুসারে বাংলার শাসক ও অভিজাতবর্গের হারেমগুলিতে দেশীয় ও বিদেশি বংশোদ্ভূত খোজারা প্রহরায় নিয়োজিত থাকত। কথিত আছে, নওয়াব শুজাউদ্দিন খানের (১৭১৭-১৭৩৯) হারেম প্রহরায় নিয়োজিত ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে সংগৃহীত খোজারা।

ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক নানা গবেষণা থেকে জানা যায় যে, বহুবিবাহ,  উপপত্নী (বাঁদি) ও হারেম ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কারণে খোজা ব্যবস্থারও উদ্ভব ঘটে। হারেমের নারীদের উপর নজর রাখার জন্য খোজাকৃত পুরুষ প্রহরী নিয়োগ করা হত। সাধারণত রণাঙ্গণে বন্দি তরুণ সৈনিকদের খোজা করা হত। খ্রিস্টপূর্ব ৮১১ থেকে ৮০৮ অব্দের আসিবিয়ার রানিমাতা সামুরামাত নিজ হাতে তার এক ক্রীতদাসকে ‘খোজা’ করেছিলেন। একটি উপকথায় তাকে সেমিরা মিস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আসিবিয়ার রানিমাতা কেন তার ক্রীতদাসকে ‘খোজা’ করেছিলেন ইতিহাসে তার বিবরণ না-থাকলেও অনেক গবেষক মনে করেন রানির বিকৃত যৌন-লালসা নিবৃত্ত করার জন্য হতভাগ্য ক্রীতদাসকে বিকলাঙ্গ করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন দেশে ‘খোজা’ করা হয়েছে। আর এই নিষ্ঠুরতা সংঘটিত হয়েছে শাসক, অভিজাত শ্রেনি এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মহলেও। শুধু যে রাজা-বাদশা বা অভিজাত শ্রেণির মহলে খোজা তৈরি হত তা কিন্তু নয়, ধর্মীয় কারণে অনেকেই খোজাকরণ বরণ করেছে, ইতিহাসে এর প্রমাণও আছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে খোজার উল্লেখ আছে। ম্যাথুর প্রবচনে আছে — ‘একদল পুরুষত্বহীন মানুষ আছে যারা মাতৃগর্ভ থেকেই অসম্পূর্ণ অবস্থাতে ভূমিষ্ট হয়েছে। আর একদল আছে যাদের অন্য মানুষ খোঁজা করেছে। তৃতীয় দলের খোজা যারা তারা স্বর্গের কামনায় স্বেচ্ছায় পুরুষহীন হয়েছে। এই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই বোধহয় একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক ঘোষণা করেছিলেন — একমাত্র কামনাশূন্য খোজার কাছেই স্বর্গের দুয়ার খোলা রয়েছে। কামনা-বাসনা শূন্য হওয়ার জন্য অনেক ধর্মপ্রচারক খোজাদের স্বপক্ষে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কামনাশূন্য সাধনা করার জন্য বিগত খ্রিস্টান সাধু ওরিজেন তার পুরুষত্ব বিসর্জন দিয়েছিলেন। ১৭৭২ সালে রাশিয়ায় একটি গোপন ধর্মীয় গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছিল, যাঁরা স্বেচ্ছায় খোজাকরণ বরণ করে নিতেন। এদের বিশ্বাস ছিল মানুষের দেহে আদম এবং ইড থেকে যে নিষিদ্ধ ফল যৌন-তাড়না করে বেড়াচ্ছে, খোজাকরণের মাধ্যমে তার অবসান ঘটানো সম্ভব। মানব এবং মানবীর জনক এবং জননী হওয়ার যোগ্যতা এই নিষিদ্ধ অদৃশ্য ফল থেকেই আসে, আর লিঙ্গ ও যোনির ব্যবহারে আর একটি মাত্র সন্তানের জন্ম হয়। এ কারণেই রাশিয়ার ওই গোপন সংগঠনের পুরুষ সদস্যরা স্বেচ্ছায় খোজা এবং নারীরা তাদের স্তন কেটে কামনাশূন্য হতে চেয়েছিল।

খ্রিস্টানদের মধ্যে স্বর্গ প্রাপ্তির আশায় শুধু খোজাকরণ বরণ করত, তা কিন্তু নয়। গির্জায় প্রার্থনা সংগীত গাওয়ার জন্য খোজাদের কদর করা হত। সিসটান চ্যাপেলে প্রার্থনা সংগীত গাওয়ার জন্য স্বয়ং পোপ তাদের আহ্বান করতেন। খোজাদের আহ্বান করার পিছনে যুক্তি ছিল খোজাদের কণ্ঠস্বর সমান তেজি, সমান গভীর এবং সমান নিখাদ। খ্রিস্ট সম্প্রদায় এই সংগীত আগ্রহভরে শ্রবণ করত, তাদের বিশ্বাস ছিল ঈশ্বরকে মুগ্ধ করার জন্য খোজা কণ্ঠের সংগীত অবশ্যই গীত হওয়া প্রয়োজন। এই ধারণা থেকে ইতালির অনেক বিখ্যাত গায়ক স্বেচ্ছায় খোজা হয়ে গিয়েছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, হারেমের প্রহরী হিসাবেও খোজারা নির্ভরযোগ্য ছিল। খোজাদের এই বিশ্বস্ততা প্রথম লক্ষ করেন সাইরাস। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে ব্যাবিলন দখল করার পর আবিষ্কার করলেন খোজাদের মতো নির্ভরযোগ্য পুরুষ সত্যিই দুর্লভ। তার এই আবিষ্কারের পিছনে যুক্তি ছিল খোজাদের যেহেতু কোনো সংসার নেই, তাই যে তাকে প্রতিপালন করবে খোজারা সুখ-দুঃখে তারই পাশে থাকবে। সাইরাস এও লক্ষ করেছিলেন যে, খোজারা পুরুষত্বহীন বলে কিন্তু তারা হীনবল নয়। সাইরাস এই বিশ্বাস থেকেই রাজ অন্তঃপুরে খোজা প্রহরী নিয়োগ করেছিলেন। এরপর বিভিন্ন দেশের হারেমে খোজা প্রহরীদের নিয়োগের হিড়িক পড়ে যায়। হেরোডোটাসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, পারস্যের মানুষরা আইনিয়ানদের দলে দলে বন্দি করে তাদের পুরুষত্বের বিনাশ করত এবং এদের সুন্দর পোশাক-আশাক পরিয়ে বিভিন্ন দেশের রাজাদের কাছে বিক্রি করে দিত। পারসিকরাই মুসলিম শাসিত রাজ্যে প্রথম খোজার আমদানি করেছিল। তুর্কিরা তো খোজার খোঁজই রাখতেন না। অবশ্য পঞ্চদশ শতাব্দীতে খোজার সন্ধান পান তুর্কি শাসকরা। এই আশ্চর্য বিশ্বস্ত এবং শক্তিমান না-নারী না-পুরুষ প্রাণীটি পেয়ে তুর্কিদের মধ্যে এই চেতনার উদয় হল যে, ইচ্ছে করলে তা তারা নিজেরাই খোজা তৈরি করতে পারে।

তুর্কি সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে অসংখ্য যুদ্ধবন্দির মাঝখান থেকে রূপবান এবং শক্তিমান পুরুষদের বেছে বেছে খোজা তৈরির মহরত শুরু করেন সুলতান প্রথম মাহমুদ এবং দ্বিতীয় মুরাদ। খোজাদের কাজ প্রথমদিকে বাদশাহ বা সুলতানের মহিষী এবং রক্ষীতাদের পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তী সময় সুলতানের হেঁসেল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে তাদের নিয়োগ করা হত।

১৮৩৬ সালে মুর্শিদাবাদের এক প্রাসাদে ৬৩ জন খোজার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এই খোজারা শুধু আজ্ঞাবাহী ভৃত্য হিসাবে নিয়োজিত ছিল না, তারা সম্রাট এবং নবাবের প্রিয়পাত্র হিসাবে কোনো কোনো সময় শাসনকার্যে প্রভাব বিস্তার করত। ইতিহাসে এ রকম একটি ঘটনার কথা জানা যায়, ঘটনাটি ঘটেছিল তুর্কি হারেমে। তুর্কিমহলের খোজা প্রধানকে বলা হত কিসলার আগা। কিসলার আগা উপাধিধারী খোজা শুধু মহলের কুমারীদের প্রধান রক্ষী হিসাবে নিয়োজিত হত। সে নিজে দাস হলে তার অধীনে থাকত চারশো গোলাম-বাঁদি। তার নামে ঘোড়াশালে আলাদা করে রেখে দেয়া হত তিনশো ঘোড়া। পুরুষত্বহীন একজন মানুষের এই বিপুল ক্ষমতা একজন খোজার শুধু অটোমান সাম্রাজ্যেই দেখা যায়নি, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মোগল আমলে অযোধ্যার একজন জনপ্রিয় আঞ্চলিক শাসক ছিল খোজা। স্পষ্টত মুসলিম বিশ্বে প্রেরিত কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের সব বা অতি উচ্চ অংশকে খোজা করা হয়েছিল, যার কারণে এসব অঞ্চলে তারা উল্লেখযোগ্য বংশধর (‘ডায়াসপোরা’) রেখে যেতে ব্যর্থ হয়। ইসলামি ক্রীতদাসত্বের নিদারুণ লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়া ইউরোপীয়, ভারতীয়, মধ্য-এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের লক্ষ লক্ষ বিধর্মীর ভাগ্যও অনেকটা একইরকম ছিল। ১২৮০-র দশকে মার্কোপোলো ও ১৫০০-র দশকে দুয়ার্ত বার্বোসা স্বচক্ষে ভারতে বিপুল সংখ্যায় খোজাকরণ প্রত্যক্ষ করেছেন। একই প্রক্রিয়া চলে সম্রাট আকবর (মৃত্যু ১৬০৫), জাহাঙ্গীর (মৃত্যু ১৬২৮) ও আওরঙ্গজেবের (মৃত্যু ১৭০৭) শাসনামলে। সুতরাং, ভারতে গোটা মুসলিম শাসনামলে খোজাকরণ ছিল একটা প্রচলিত নিয়ম। সম্ভবত এটা ইতিপূর্বে উল্লেখিত ভারতের জনসংখ্যা ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ২০ কোটি থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ কোটিতে হ্রাসকরণে একটা বড়ো অবদান রেখেছিল।

খোজাদের মধ্যে বুদ্ধিমান এবং স্মৃতিশক্তিধর হিসাবে যাদের পাওয়া যেত সুলতান এবং সম্রাটেরা তাদের রাজকার্যে নিয়োজিত করতেন। তবে বুদ্ধিমান খোজার সংখ্যা ছিল খুবই কম। খোজাদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ খোজাই বদমেজাজি, বালসুলভ, প্রতিশোধপরায়ণ, নিষ্ঠুর এবং উদ্ধত। অবশ্য এর বিপরীত স্বভাবের খোজাও রয়েছে এরা সরল, নিরীহ, আমোদপ্রিয় উদার। অবশ্য খোজাদের মেজাজ মর্জি এই বৈপরীত্যের কারণ তাদের খোজাকরণের বয়সের উপর নির্ভর করত। কম বয়সে খোজা করার পর ওই খোজা কারও উপর ক্রোধান্বিত হলে এবং সুযোগ পেলে তাকে হত্যা করতেও দ্বিধা করত না।

জে. রিচার্ড লিখিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায়, সাধারণভাবে খোজা বা পুরোপুরি অক্ষম এই কথাটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকলেও খোজারা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যৌন-অক্ষম নয়। রিচার্ড একজন বিবাহিত খোজার স্ত্রীর সংগে আলাপের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, স্ত্রীলোকটির কথায় মনে হচ্ছিল ওরা পুরোপুরি তৃপ্ত এবং সুখী। চিয়েন লুঙ-এর আমলে একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, পিকিংয়ের হারেমের এক খোজা পুরোহিতের কাছে ঔদ্ধত্ব প্রকাশ করে বলেছিল, খোজার উপর পুরোহিতের কোনো এক্তিয়ার নেই। পুরোহিত খোজাকে হেকিমের কাছে নিয়ে গেলেন। পরীক্ষা করে দেখা গেল তার পৌরুষত্ব ফিরে এসেছে। আসলে সে ছিল এক নকল খোজা।

খোজা ব্যাপারটা কী ? সাধারণত দু-রকম ব্যবস্থাকেই খোজা বলে। একটি হল (১) Castration (Removal of the testicles), অপরটি (২) Penectomy (Penis Removal)। ক্যাসট্রেশন (Castration) হল আসলে পুরুষের ভাসডিফারেন্স বা শুক্রনালীকে কেটে দেওয়া হয়। এই শুক্রনালী শুক্রাণু বহন করে। কাজেই শুক্রাণু বীর্যে আসতে পারে না।কাজেই এই পুরুষের পক্ষে নারীর গর্ভসঞ্চার করানো হয় না । এটি পুরুষের স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা ভেসেকটমি বলে পরিচিত। ভেসেকটমি অপারেশনের পর সেই পুরুষের যৌনইচ্ছা, যৌনক্ষমতা, যৌন-আবেদন কোনোটাই হ্রাস পায় না। হারেমের খোজাদের বেশিরভাগেরই এই পদ্ধতিই অবলম্বন করা হত। তবে Penectomy খোজা হল পুরুষের লিঙ্গটাকে কেটে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলা। বাৎসায়নের আগেই কৌটিল্য তাঁর “অর্থশাস্ত্রম্”-এ এক বিশেষ ধরনের পুরুষের কথা উল্লেখ করেছেন। এরা ‘নপুংসক’। পুরুষাঙ্গ ছেদন করে এদের নপুংসক করা হত। এরা ছিল রাজ-অন্তঃপুরের পাহারাদার। শুধু মহিলারক্ষীদের এই করানো বেশ কঠিন ছিল। আবার পুরুষরক্ষীবাহিনীকে বিশ্বাস করা যেত না। এদের দ্বারা অতঃপুরবাসিনীর শ্লীলতাহানি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিছু পুরুষকে লিঙ্গ কেটে খোজা করে দেওয়া হয়। রাজ-অন্তঃপুরের বা হারেমের মহিলারা এইসব খোজাদের দিয়ে বিকৃতভাবে তাঁদের যৌনক্ষুধা মেটাতো। রাজা বা বাদশাও ম যাবে কেন ? এদের অনেকেই পুরুষসঙ্গমে তৃপ্ত হতেন। লিঙ্গ কেটে ফেললে যৌনমিলন একেবারেই অসম্ভব।হিজড়া-মহলে কীভাবে লিঙ্গ কর্তন বা খোজা (Penectomy) করা হয় সেটা জানা যেতে পারে। বীভৎস নারকীয় এবং অবৈজ্ঞানিক উপায়ে লিঙ্গ শরীর থেকে কেটে ফেলা হয়। হিজড়া বানানোর জন্য নিয়ে আসা ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট ঘরে অন্তরীণ অবস্থায় ১১ দিন থাকতে হয়। সূর্যের আলো পর্যন্ত দর্শন করতে পারবে না সে। প্রথম প্রথম মহল্লার হিজড়ারা এর সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করে। চলে আদর আর যত্ন। লিঙ্গচ্ছেদনের জন্য হবু হিজড়ার সম্পত্তি আদায় করে নেয়। যৌন পরিবর্তনকামীরা মত দিলেও অন্যরা মত দিতে রাজি হয় না। রাজি না-হলে চলে দৈহিক আর মানসিক নির্যাতন। এই সময়ে হবু হিজড়াকে প্রচুর পরিমাণে মাদক সেবন করানো হয়। অমানবিক অত্যাচার ও মাদকের প্রভাবে তার স্বাভাবিক চেতনা লুপ্ত হয়।ঠিক ১১ দিন পর অনেক রাতে মহল্লার দলপতি তার অনুগত কয়েকজনকে হিজড়াকে নিয়ে ওই ঘরে ঢোকে। নেশায় আচ্ছন্ন হবু হিজড়াকে উলঙ্গ করে হাত-পাঁ বেঁধে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরা হয়।যাতে চিৎকার করতে না-পারে সেজন্য মুখের ভিতর কাপড় জাতীয় কিছু গুঁজে দেওয়া হয়। এরপর কালো ফিতে দিয়ে লিঙ্গ ও অণ্ডকোশ একসঙ্গে সজোরে বেঁধে দু-দিক থেকে টেনে ধরা হয়। মাথা একদিকে হেলিয়ে কয়েকজন হিজড়া তাকে চেপে ধরে রাখে। এরপর দলপতি অত্যন্ত ধারালো ছুরি বা ক্ষুর দিয়ে ঘ্যাচাং করে লিঙ্গটি কেটে ফেলে। তখন প্রচুর পরিমাণে রক্ত নিঃসরণ হতে থাকে। হিজড়াদের ধারণা এই রক্তপাতের মধ্য দিয়ে শরীরের সমস্ত পুরুষ-রক্ত বেরিয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে শরীরে নারী-রক্তের জন্ম হয়। একে ওরা ‘নির্বাণ’ বলে। নির্বাণের মধ্য দিয়ে হিজড়ার জন্ম হয়। সে যাই হোক, প্রসঙ্গে আসি। লিঙ্গচ্ছেদনের পর ওই ব্যক্তিকে চিৎ করে শুইয়ে তার ক্ষতস্থানের নীচে একটি পাত্র রাখা হয়। ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত ওই পাত্রে রাখা হয়। কর্তিত লিঙ্গটিও রাখা হয় ওই পাত্রটিতেই।পরদিন সকালে পাত্রটিকে ফুল দিয়ে সাজানো একটি ঝুড়ির মধ্যে নিয়ে হিজড়ারা মিছিল করে চলে কাছেপিঠের কোনো জলাশয়ে। সেখানেই ঝুড়িটি ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ছেদনকার্যের পর নতুন হিজড়াকে ৪৮ ঘণ্টা ঘুমোতে দেওয়া হয় না। ক্ষতস্থান রক্ত বন্ধ করার জন্য ঘুটে পোড়া ছাই খয়ের ভিজিয়ে পুরু করে ওই ক্ষতস্থানের ছাইয়ের উপর লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গাটি প্লাস্টারের মতো শক্ত হয়ে যায়। নির্মাণ হয় এক লিঙ্গকবন্ধ হিজড়া।

লিঙ্গ কর্তনের পর আর-একটি প্রধান কাজ হল স্তন-দুটিকে পুষ্ট করা। এটি হিজড়াসমাজের অত্যন্ত গোপনে হয়, যাকে বলে ট্রেড সিক্রেট। লিঙ্গ কর্তনের কয়েকদিন পর নতুন হিজড়া একটু সুস্থ হয়ে উঠলে মহল্লার দলপতি তাকে Lyndiol (চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ট্যাবলেট খাওয়া অনুচিত) নামে এক ধরনের জন্ম নিরোধক ট্যাবলেট খাওয়ায়।বেশ কয়েক মাস ধরে এই ট্যাবলেট সেবন করানো হয় রোজ, নিয়মিত। এই ট্যাবলেটে ইথিলিন অস্ট্রাডাইওলের পরিমাণ একটু বেশি থাকে। ফলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। হরমোনের কু-প্রভাবে স্তনগ্রন্থিতে স্নেহজাতীয় পদার্থ সঞ্চিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে পুরুষ-বক্ষ থেকে নারী-স্তনের মতো স্ফীত ও পরিপুষ্ট হতে থাকে। নারীদের মতোই স্তনবৃন্তও ফুলে ওঠে।তবে যাদের আর্থিক সামর্থ্য থাকে তারা প্ল্যাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে স্তন প্রতিস্থাপন বা সিলিকন ব্রেস্ট করিয়ে নেয়। খুবই ব্যয়সাপেক্ষ এই পদ্ধতি আমাদের দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বে প্রায় অসম্ভব হলেও ধনতান্ত্রিক দেশগুলির হিজড়ারা সিলিকন ব্রেস্ট বানিয়ে নেয়। তবে তারা কিন্তু সকলেই লিঙ্গ কর্তন করে না। পর্ন-দুনিয়ায় এদের বেশ কদর আছে। এরা “Shemale”বা “Ladyboy”। তবে সোমনাথ ওরফে মানবী মনে করেন, “মেয়ে হিজড়ে ছেলে হিজড়ে বলে কিছুই নেই। সকলেই সমান হিজড়ে। হিজড়ে দলে দু-রকম মানুষ – আকুয়া আর নির্বাণ। আকুয়ারা পেনিস-টেসটিস এখনো কেটে ফেলে দেয়নি, আর নির্বাণ হল তারাই যারা কেটে ফেলে দিয়েছে”। বহুচেরা মাতার (হিজড়াদের দেবতা) মন্দিরে ‘কমলিয়া’ নামে এক বিশেষ হিজড়া সম্প্রদায় আছে। এরা পুরুষ। এরা একই সঙ্গে নিজেদের নারী ও পুরুষ হিসাবে কল্পনা করে। তাই লম্বালম্বিভাবে দেহের এক অংশে পুরুষের পোশাক এবং অপর অংশে নারীর বেশ ধারণ করে। এই ‘কমলিয়া’ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

হিজড়াসমাজের রীতিনীতি : সামাজিক মূলস্রোত থেকে এই সমাজ সম্পূর্ণই বিচ্ছিন্ন। হিজড়াসমাজের রীতিনীতি , আচার-ব্যবহার, ধর্মীয় অনুশাসন সবই আলাদা। প্রত্যেক হিজড়া মহল্লায় একজন দলপতি থাকেন। এরা ‘গুরু-মা’ বলে পরিচিত। এই গুরু-মাই দলের অভিভাবক। গুরু-মায়ের আন্ডারে হিজড়ারা হল তার শিষ্য, চেলা বা মেয়ে। অবাধ্য হওয়া তো দূরের কথা, শিষ্যেরা গুরু-মাকে খুবই মান্য করে।শিষ্য সংগ্রহ করা এবং তাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে কাজে পাঠানো গুরু-মায়ের অন্যতম প্রধান কাজ। গুরু-মায়ের তত্ত্বাবধানে শিষ্যরা নাচ-গান-বাজনা শিখতে থাকে। শুধু নাচ-গান-বাজনা শিখলেই হয় না, তালি দেওয়া শেখাটাও অত্যন্ত জরুরি।সবাই জানেন, হিজড়াদের তালি বিশেষ ধরনের। দুটি হাতের চেটোকে ৯০ ডিগ্রি কোণ করে এই তালি দেওয়া হয়।

হিজড়া দুনিয়ার প্রচলিত রীতি অনুসারে প্রত্যেক গুরু-মায়ের কাজের কিছু নির্দিষ্ট এলাকা থাকে। এই এলাকায় তিনিই হলেন হিজড়াদের বস। হিজড়া মহল্লায় একজন গুরু-মায়ের অধীনে কতজন শিষ্য থাকবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তবে যেসব শিষ্যরা মহল্লায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে তারা হল ‘সাধারণ শিষ্য’। একই গুরু-মায়ের সাধারণ শিষ্যেরা একে অন্যের গুরু-বোন। গুরু-মায়ের অবর্তমানে তার সম্পত্তির সমান অংশ পায় শিষ্যেরা।তবে অনেক সময় মৃত্যুর আগেই গুরু-মা তার সমস্ত সম্পত্তি কোনো একজন শিষ্যকে উইল করেও দিয়ে যান।

হিজড়াদের জীবনজীবিকা : স্বাভাবিক মানুষদের মতো হিজাড়ারাও নানাবিধ পেশায় যুক্ত থাকে, যদিও সীমিত ক্ষেত্র। দেখা যাক — (১) বাচ্চা নাচানোই এদের প্রধান জীবিকা।সাধারণত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে নবজাতকের জন্মের কথা ওরা জানতে পারে। তারপর একদিন দলবল নিয়ে হাজির হয় নবজাতকের বাড়িতে।বাচ্চাকে কোলে নিয়ে শুরু হয় নাচা-গানা। বাচ্চা নাচানোর পর ওরা যে টাকাপয়সা ও অন্যান্য দ্রব্য দাবি করে, তা বেশিরভাগ সময়ই জুলুমের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। প্রাপ্য দাবি না-মিটলে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি এবং অশ্রাব্য গালিগালাজ দিয়ে নবজাতকের পরিবারকে হেনস্থা করতে থাকে।এই ঔদ্ধত্য ও দুর্বিনীত আচরণ শেষপর্যন্ত বাক্-বিতণ্ডা এবং হাতাহাতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।বাচ্চা নাচিয়ে যে অর্থ উপার্জন হয় তার অর্ধেক গুরু-মা ও অর্ধেক শিষ্যেরা পায়। অবশ্য কোনো কোনো অঞ্চলে উপার্জিত অর্থের এক-চতুর্থাংশ শিষ্যেরা পায়।(২) গুরু-মায়েরা দালাল মারফৎ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সুশ্রী ‘নাগিন’ হিজড়াদের পাঠিয়ে থাকে। দালালরা এদের নিয়ে তোলে ওইসব অঞ্চলের কিছু ব্যক্তির কাছে, যারা ‘মাস্টারজি’ নামে পরিচিত।এই মাস্টারজিদের তত্ত্বাবধানে নাগিনরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিন্দি ফিল্মি দুনিয়ার চিত্তবিনোদক নৃত্য পরিবেশন করে।এইভাবে যে অর্থ উপার্জন হয় তার সিংহভাগই মাস্টারজির পকেটে চলে যায়। গুরু-মায়েরও দালালদের মাধ্যমে এই অর্থের একটা বড়ো অংশ লাভ করেন। (৩) মূল্য না দিয়ে বাজার থেকে সবজি-তরিতরকারি জোর করে তুলে নেয়। এই ‘তোলা’ তোলা ব্যবস্থা বহু বছর ধরে চলে আসছে। আজকার দূরপাল্লার ট্রেনে ও বাসেও এদের তোলা তুলতে দেখা যায়।(৪) আন্তর্জাতিক চোরাচালানের সঙ্গেও হিজড়ারা যুক্ত থাকে। বিভিন্ন স্মাগলার ডনদের আন্ডারে কিছু গ্যাংলিডার আছে। সেই গ্যাংলিডারদের একটা বড়ো অংশই হিজড়া।(৫) হিজড়াদের একটা অংশ দেহ ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে অর্থ ও যৌনসুখের আশায়। সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষায়, “হিজড়াদের একমাত্র জ্বালা-যন্ত্রণা-প্রতিহিংসার বিষয় হল – নরনারীর ‘স্বাভাবিক’ জীবন”।বেশ্যাপাড়ায় সত্যিকারের মেয়েদে হারিয়ে ‘পারিক’ হিজড়াদের হিজড়াদের চাহিদা বেড়েছে।কম বয়সি হিজড়ারা ‘কলগার্ল’ হিসাবেও এরা যৌনপেশায় লিপ্ত থাকে। হিজড়া মহল্লার বাইরে সমকামী অ্যাকটিভ পুরুষের কাছে হিজড়াদের বেশ চাহিদা আছে। এরা নারীর স্থলাভিষিক্ত পুরুষ যৌনকর্মী। মুম্বাই শহরে হিজড়াদের উপর বিশেষ অনুসন্ধান চালিয়ে ডাঃ ঈশ্বর গিলাডা এক সমীক্ষায় বলেছেন – সেখানকার প্রায় ৬০ শতাংশ হিজড়া বেঁচে থাকার তাগিদে বেশ্যাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

হিজড়াদের যৌনকর্ম : যৌনাঙ্গ বিকৃতির কারণে এরা অন্যভাবে যৌনক্ষুধা মেটায়। মূলত এরা পায়ুকামের (Sodomy) মাধ্যমে যৌনতা করে। মেয়েদের মতো Passive বা নিষ্ক্রিয় যৌনসঙ্গী হন। এরা সকলেই পায়ুমিলনে অভ্যস্ত। এই পায়ুপথই (Anal Canal) নারীর যৌনাঙ্গের (Vagina) সমতুল্য। শুধু রোজগারের জন্যই এইসব হিজড়ারা সমকামী কোনো ব্যক্তির সঙ্গে পায়ুমিলনে লিপ্ত হয় না, অবদমিত যৌনক্ষুধাকে তৃপ্ত করার জন্যও এরা সমকামে আসক্ত হয়ে পড়ে। মূত্রছিদ্র দিয়ে এক ধরনের রস নিঃসরণের (Urethral Smear) মধ্য দিয়ে এদের যৌনসুখের চরম তৃপ্তি বা অর্গাজম অনুভূত হয়।

হিজড়াদের ভোটাধিকার : হিজড়ারা আগেও ভোট দিত, এখনও দেয়। তবে হিজড়া হিসাবে ভোট দেওয়া যায় না। যেহেতু এরা নারী-বেশ ধারণ করেন এবং স্ত্রীলিঙ্গে নাম ধারণ করে সেইহেতু ভোটের সময় এরা স্ত্রী ভোটার হিসাবেই চিহ্নিত হয়। অথচ রহস্যজনকভাবে এরাই আবার জনগণনায় ‘পুরুষ’ হিসাবে নথিভুক্ত হয়। সর্বভারতীয় হিজড়া কল্যাণ সভার সভাপতি শ্রী খৈরাতিলাল ভোলা হিজড়াদের ‘হিসাবে’ ভোট দেওয়ার আইনি স্বীকৃতি আদায় করার জন্য ‘Election Commisson of India’-র কাছে আবেদন জানিয়েছেন।আবেদনে সাড়া দিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সমস্ত মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের ভোটার তালিকায় হিজড়াদের ‘হিজড়া’ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ পাঠান। সমস্যাটা আর-এক জায়গায় – সমস্ত হিজড়াই নিজেদের ‘স্ত্রীলোক’ হিসাবেই পরিচয় দিতে আগ্রহী। তারা চায় না ভোটার তালিকায় ‘হিজড়া’ হিসাবে নাম থাকুক।

হিজড়াদের সংস্কার : হিজড়া দুনিয়ায় সব সদস্যকেই বেশকিছু নিয়মনীতি মান্য করে চলতে হয়।যেমন – (১) রাস্তায় অপরিচিত কোনো পুরুষের সঙ্গে হালকা চালে কথা বলা এবং অশালীন আচরণ হিজড়াসমাজে গর্হিত অপরাধ।(২) সন্ধ্যার পর হিজড়া মহল্লার সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অতি পরিচিত কোনো ব্যক্তি ছাড়া ভিতরে প্রবেশ নিষেধ। অবশ্য ঝুপড়িবাসীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না (৩) খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বা আমন্ত্রণ না-পেলে কোনো গুরু-মা সাধারণত অপর কোনো গুরু-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান না। (৪) কোনো গুরু-মা মাটিতে বসে থাকলে তা চেলা বা শিষ্যরা খাটে বা উঁচু কোনো জায়গায় বসে না।(৫) কিছু কিছু মহল্লায় হিজড়ারা খুব ভোরে উঠে প্রধান দরজার চৌকাঠে ঝাঁটা বা লাঠি দিয়ে আঘাত করে। অনেকে আবার মহল্লার মাথায় ছেঁড়া জুতো বেঁধে রাখে। (৬) হিজড়ারা মনে করে সন্তানসম্ভবা কোনো মহিলার উদর বা পেট যদি কোনো হিজড়া বিশেষভাবে নিরীক্ষণ করে তাহলে গর্ভস্থ সন্তান হিজড়া হয়ে ভূমিষ্ঠ হবে। (৭) হিজড়ারা মনে করে হিজড়াদের লেখা চিঠি যদি কোনো গর্ভবতী মহিলা পাঠ বা স্পর্শ করে তাহলে ভ্রূণের ক্ষতি হবে ইত্যাদি।

হিজড়াদের ঢোল : হিজড়াদের জীবনে ঢোল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।বাচ্চা নাচাতে ঢোলের বাজনা অত্যাবশ্যক অনুসঙ্গ। কর্মক্ষেত্র ছাড়া অকারণে গুরু-মায়ের সামনে ঢোল বাজালে বা হাতের তালি দিলে শিষ্যদের ক্ষতি হবে বলে বিশ্বাস। হিজড়াদের বিশ্বাস ঢোল পায়ে লাগা পাপ। সকালে, বিকালে ঢোলকে এরা প্রণাম করে। কোনো-কোনো মহল্লায় কাজের শেষে ঢোলগুলিকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে সিঁদুরের ফোঁটা দেওয়া হয়। সকালে কাজে বেরনোর আগে যদি কোনো অ-হিজড়া ঢোল স্পর্শ করে তাহলে ঢোলটি অপবিত্র হয়ে যায়। সেদিনের জন্য ওই ঢোল বাতিল, অন্য ঢোল নিয়ে কাজে বেরতে হয়।হাজারো বিপদের মাঝে নিজে জান দিয়ে হলেও ঢোলকে অক্ষত রাখা হিজড়াদের অসীম কর্তব্য।হিজড়াদের বিশ্বাস, এই ঢোল যদি অন্য কেউ কেড়ে নেয় তাহলে মনে করা হয় বিপদ নিকটেই।এছাড়া মহল্লার গুরু-মায়ের সম্মতি ছাড়া ঢোল কেনা গর্হিত অপরাধ। সমস্ত হিজড়া মহল্লায় ঢোল পুজো হয়। ঢোল পুজো এদের একটি বাৎসরিক উৎসব। কালীপুজোর রাতে এরা ঢোলের আরাধনায় বসে।এদিন কেউ কাজে বেরন না। নিরামিষ খাবে সবাই। ঢোল পুজোর অনুষ্ঠানে বাইরের কেউ প্রবেশাধিকার পায় না।পুরোনো চামড়ার ঢোল এই পুজোর বাতিল।যাই হোক, পুজোয় বসে গুরু-মা। কোনো নির্ধারিত মন্ত্র-টন্ত্র নেই এই পুজোয়।গুরু-মা চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে, ধ্যান ভাঙলে পুজো শেষ।

হিজড়াদের ধর্মবিশ্বাস : জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়নির্বিশেষে সমস্ত রকমের ভেদাভেদ ভুলে এক সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলেছে হিজড়া সমাজ।যে-কোনো হিজড়া মহল্লায় দেখা মিলবে সব ধর্মের হিজড়া। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এরা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গড়ে তুলেছে। ধর্মের ব্যাপারে কোনো বাড়াবাড়ি বা রক্ষণশীলতা এক্কেবারেই নেই। সব ধর্মের দেব-দেবতাই সকল হিজড়াদের ইষ্টদেবতা।

হিজড়াদের মন মনন : নারী না-হয়েও হিজড়ারা নিজেদের নারীরূপে ভেবে থাকে। মহিলাদের পোশাক-আশাক, মহিলাদের অলংকার-কসমেটিক-শৃঙ্গার এদের পছন্দ অপ্রতিরোধ্য।ট্রেনে-বাসে লেডিস সিট, লেডিস কম্পার্টমেন্ট, লেডিস ট্রেন, লেডিস বাসে চড়ে বা উঠে যাতায়াত করে। ভুলেও এরা জেনারেল আসন বা কম্পার্টমেন্ট ব্যবহার করে না। শেষ মুর্হূতে ট্রেনের জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়লেও পরের স্টপেজে নেমে লেডিস কম্পার্টমেন্টে ওঠে।পুজোর প্যান্ডেলে বা যাত্রার এদের মহিলাদের মধ্যেই দেখা যায়। বস্তুত এরা নিজেদেরকে অম্বার জাত বা উত্তরসূরী ভাবে। অম্বা মহাভারতের একটি অভিশপ্ত চরিত্র। গল্পটা একটু বলি : ভাই বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য স্বয়ংবর সভা থেকে ভীষ্ম অম্বাকে হস্তিনাপুরে নিয়ে এলেন। কিন্তু শাল্বরাজার প্রতি অনুরাগের কথা শুনে ভীষ্ম অম্বাকে মুক্তি দেন। অপরদিকে শাল্বরাজ অম্বাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এহেন ঘটনার অম্বা জোর গলায় ভীষ্মকে অভিযুক্ত করে। এখানেই শেষ নয়, অম্বা ভীষ্মকে ধ্বংস করবে এমন বিধ্বংসী তপস্যায় ব্রতী হলেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে অম্বাকে বর দিলেন। বললেন – এ জন্মে নয়, পরজন্মে নপুংসক ‘শিখণ্ডী’ হয়ে অম্বা জন্মগ্রহণ করবেন এবং ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবে। হিজড়ারা এই কাহিনি জানে, জানে বলেই তারা নিজেদেরকে অম্বার সঙ্গে গভীর একাত্মতা অনুভব করে। হিজড়ারা বিশ্বাস করে তারা নপুংসক শিখণ্ডী – এ জন্মের আগে তাদেরও ছিল স্বাভাবিক জীবন এবং পরের জন্মে আবার নারীজন্ম ফিরে পাবে।

স্বাভাবিক কর্মজীবনে হিজড়াদের ভূমিকা : হিজড়াদের সেই ‘পরিচিত’ কর্মের বাইরে মূলস্রোতে কর্মরত অবস্থাতেও দেখা যাচ্ছে। কিছু খ্রিস্টান সংঘ হিজড়াদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। ইউনিটারিয়ান একটি উদার ধর্মমত। তাদের মূল খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭৯ সালে তারাই সর্বপ্রথম হিজড়াদের পূর্ণ সদস্য হিসাবে গ্রহণ করে। and the first to open an Office of Bisexual, Gay, Lesbian, and Transgender Concerns in 1973. ১৯৮৮ সালে উইনিটারিয়ান উইনিভার্সালিস্ট অ্যাসোসিয়েশান প্রথম একজন হিজড়া ব্যক্তিতে মনোনীত করে। ২০০২ সালে শ্যন ডেন্নিসন প্রথম হিজড়া ব্যক্তি যিনি ইউনিটারিয়ান ইউনিভার্সালিস্ট মন্ত্রনালয়ে ডাক পান। ২০০৩ সালে ইউনাইটেড চার্চ অফ খ্রিস্ট সকল হিজড়া ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে মত দেয়। ২০০৫ সালে ট্রান্সজেন্ডার সারাহ জোনস চার্চ অফ ইংল্যান্ডের ধর্মযাজক হিসাবে নিয়োগ পান। ২০০৮ সালে ইউনাইটেড মেথোডিস্ট চার্চ জ্যুডিশিয়াল কাউন্সিল রায় দেন যে ট্রান্সজেন্ডার ড্রিউ ফনিক্স তার পদে বহাল থাকতে পারবেন। ওই একই বছরে মেথোডিস্টদের একটি সাধারণ বৈঠকে একাধিক হিজড়া ক্লারজির বিরুদ্ধে পিটিশান খারিজ করে দেয়া হয়। ভারতের বিহারে ‘কালী হিজড়া’ পশ্চিম পাটনা কেন্দ্র থেকে ‘জুডিসিয়াল রিফর্মস’ পার্টির প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে পশ্চিমবাংলার টিটাগড় পৌরভোটে ১৪ নং ওয়ার্ড থেকে ‘হিজড়া’ বৈজয়ন্তীমালা মিশ্র ভোটপ্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের লোকসভায় মহারাষ্ট্রের জালনা কেন্দ্র থেকে নির্দল হিজড়া প্রার্থী রমেশ ওরফে মালা ভোটপ্রার্থী হয়েছিলেন।

উত্তর চব্বিশ পরগণার নৈহাটীর কারখানা শ্রমিক বাবার মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলে হিসেবে জন্ম হয় সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে কলকাতার একটি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। পড়াশোনা শেষে পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী (ঝাড়গ্রাম) অধ্যুষিত অঞ্চলের এক কলেজে বাংলার শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন তিনি। এ সময়েই নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে লেখালেখি ও সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে ২০০৩ সালে জটিল এক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিজেকে নারীতে রূপান্তরিত করেন সোমনাথ, এখন তিনিই মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫১ বছর বয়সি মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় এখন পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ। ২০১৫ সালের ৯ জুন থেকে তিনি নতুন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। ভারতে প্রথমবারের মতো তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) একজনকে কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ করা হয়েছে। (এই পোস্টের সঙ্গে যে ফোটোগ্রাফটি দেওয়া হয়েছে, ইনিই মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়) এটা তৃতীয় লিঙ্গদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।সম্প্রতি অনেকে নিশ্চয় লক্ষ করেছেন যে, ভারত সরকারের একটি ট্র্যাফিক সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন হিজড়াদের দিয়ে করানো হয়েছে।তবে বাংলাদেশে হাসিনা সরকার হিজড়াদেরকে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজে লাগানো যায় কি না ভাবছেন।

হিজড়াদের মৃত্যু সৎকার : সাধারণ মানুষের কাছে এ এক রহস্যজনক অধ্যায়। কোনো রহস্য নেই, সবটাই উন্মোচিত। এদের প্রতি আমাদের চরম অবহেলা আর উদাসীনতাই রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। হিজড়াদের মৃতদেহ কেউ দেখেছে কি না এ প্রশ্ন অনেকসময় শুনতে হয়। উত্তর সবার কাছে নেই, তাই ভ্যাবাচাকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তেমন কিছু করারও নেই। বস্তুত হিজড়াদেরও মৃত্যু হয়, মৃতদেহও হয়, মৃতদেহের সৎকারও হয়।মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে হিজড়াদের শবযাত্রাও হয়। তবে তা নিঃশব্দে গভীর রাতে। শ্মশান বা গোরস্থানের কিছুটা আগে মৃতদেহকে দাঁড় করানো হয়। এরপর চতুর্দিক থেকে মৃতদেহকে ঘিরে থাকে হিজড়ারা। তারপর মৃতদেহকে কিছুক্ষণ হাঁটানো হয়। মৃতদেহকে কি হাঁটানো সম্ভব ? মোট্টেও সম্ভব নয়। অগত্যা টেনে হিঁছড়ে নিয়ে আসা হয়। শ্মশান বা গোরস্থানে এসে নির্দিষ্ট জায়গায় শুইয়ে দিয়ে মৃতদেহকে উপর্যুপরি লাথি মারা হয়।লাঠিপেটাও করা হয়। মৃতব্যক্তি যত বড়ো প্রিয় মানুষ হন না-কেন এই আচরণে অন হিজড়াদের একদম কাঁদা চলবে না।নিয়ম নেই। হিন্দু হলে নগ্ন করে চিতার উপর শোয়ানো হয়, মুসলমান হলে মাটি দেওয়ার আগে মৃতদেহকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে স্নান করানোর রীতি আছে। তবে পঞ্জাবের বেশ কিছু জেলায় মৃত্যুর পর বাড়ির ছাত সরিয়ে হিড়াদের বাইরে বের করে আনা হয়। যাতে খোলা ছাতের মধ্য দিয়ে মৃতব্যক্তির আত্মা চিরতরে আকাশে বিলীন হয়ে যায়।অপরদিকে মৃতব্যক্তি যদি গুরু-মা হন তবে হিন্দুদের বেলায় তার বড়ো মেয়ে বা শিষ্য বা চেলা মুখাগ্নি করবে। মুসলমান হলে বড়ো মেয়ে বা শিষ্য বা চেলাই পারলৌকিক সমস্ত ক্রিয়াকর্মের সম্পাদনের মূল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়।এরপর কোথাও দীর্ঘ এক মাস কোথাও-বা ৩৯ দিন ধরে চলে অশৌচ পর্ব। অন্য হিজড়া মহল্লার হিজড়ারও অশৌচ পালন করে, তবে সেটা চারদিনের মাত্র।হয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠানও, নিমন্ত্রণ রক্ষা করে হিজড়ারাই।

সেই প্রশ্নটাই আবার ঘুরে ফিরে এল। হিজড়া আর সমকামী কি সমার্থক ? বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।আদিকাল থেকে সমকাল পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্যেও মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অভিলাষ সমকামিতার প্রতিফলন। অথচ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদালতের রায়ে সহস্রাব্দ প্রাচীন সমকাম আজ বিকৃত সমকামিতা অপরাধ। গ্রিক সভ্যতা থেকে প্রাচীন ভারত। সমকামিতার উদাহরণ যুগে যুগে। প্রাচীন নাগরিক সমাজ, ব্যক্তির স্বাধীনতা, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা যেখানে জন্ম নিয়েছিল গ্রিসে। সেই গ্রিস, যে কখনও নাগরিকের যৌন স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। সমলিঙ্গ যৌন সংসর্গের বৈধতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না সেখানে। হেরোডেটাস, প্লেটোর মতো দার্শনিক-চিন্তাবিদদের লেখায় প্রায়ই পাওয়া যায় সমকামী সম্পর্কের কথা। আনুমানিক খ্রিস্ট পূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রিসের লেসবস দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন স্যাফো। এই মহিলা কবির লেখার প্রতিটি পরতে পরতে নারী শরীরের বন্দনা। স্যাফোর জন্মস্থান লেসবস থেকেই তো অভিধানে জায়গা পেয়েছে লেসবিয়ান শব্দটি। পাশ্চাত্য থেকে এবার আসা যাক প্রাচ্যে। ইতিহাস বলছে, প্রাচীন পারস্যে সমকামী সম্পর্কের প্রচলন ছিল। যেমনটা ছিল, এই ভারতবর্ষেও। বহু হিন্দু মন্দিরের দেওয়ালের ভাস্কর্য তো সমকামেরই অভিজ্ঞান। পুরাণে বিষ্ণুর মোহিনী রূপ আর অর্ধনারীশ্বর শিব, মহাকাব্য- পুরাণের পাতায় পাতায় যেন তৃতীয় লিঙ্গের সদর্প উপস্থিতি। এমনকী, বাতসায়নের কামসূত্রও বলছে সমকামিতা যৌন সম্পর্কেরই অন্য রূপ।

সমকামিতা বলতে আমরা সাধারন অর্থে বুঝি পুরুষের সঙ্গে পুরুষের বা নারীর সঙ্গে নারীর যৌন সম্পর্ক। সমকামিতা কিন্তু যৌন সম্পর্কের উপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে যৌন আকর্ষণের উপরে। একটি ছেলে কোনোদিন যৌন সম্পর্ক করেনি, কিন্তু করলে সে একটি মেয়েকেই বেছে নেবে। সে মেয়েদের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করে বা প্রেমে পড়ে। ছেলেটি যদি ঠিক তেমন আকর্ষণ একটি ছেলের প্রতি অনুভব করে বা ছেলে হয়ে ছেলের প্রেমে পড়ে তখন সে সমকামী। যৌন সম্পর্ক হোক বা না-হোক। মোদ্দা কথা হল — সমকামিতা একটা পছন্দ, কাজ নয়। স্বাভাবিক যৌন আকর্ষণ সম্পন্ন ব্যক্তিকে, অর্থাৎ একজন নারী একজন পুরুষকে অথবা একজন পুরুষ একজন নারীর প্রতি যৌন-আকর্যণ বোধ করলে, তাকে স্ট্রেইট (Straight) বলা হয়। সমকামিতা কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ধারণা আছে। এ সংক্ষেপে শ্রেণিবিভাগগুলি আলোচনা করে নিতে পারি বোঝার জন্য। এই শ্রেণিবিভাগ করে হয়েছে একজন নিজেকে কী মনে করে ও কী পছন্দ করে তার উপর ভিত্তি করে।

(১) গে (Gay) : একজন পুরুষ নিজেকে পুরুষ মনে করে। পুরুষের পোশাক পরে এবং একজন পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। এই ধরনের দুইজন পুরুষ বিয়ে করলে এদের মধ্যে স্বামীকে ‘টপ’ এবং স্ত্রীকে ‘বটম’ বলে।

(২) লেসবিয়ান (Lesbian) : একজন মেয়ে নিজেকে মেয়ে মনে করে। মেয়েদের পোশাক পরে এবং একজন মেয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। এই ধরনের দুইজন মেয়ে বিয়ে করলে এরা পুরুষালি পোশাকে ও আচরণে একজন স্বামীর ভুমিকা পালন করে।

(৩) ট্র্যানি : একজন পুরুষ সে নিজেকে মেয়ে মনে করে। অথবা একজন মেয়ে, সে নিজেকে পুরুষ মনে করে। সে মনে করে সে ভুল দেহে জন্মেছে। এরা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পড়ে। অনেকে হরমোন প্রয়োগ ও অস্ত্রপচার করে দেহের পরিবর্তন করে বিপরীত লিঙ্গের হওয়ার চেষ্টা করে। মোদ্দা কথা এদের দেহ এক লিঙ্গের, কিন্তু মন আর-এক লিঙ্গের। যে-কোনো লিঙ্গের প্রতি এদের আকর্ষণ থাকতে পারে। তবে বেশির ভাগ হিজরা এই ‘ট্রানি’ ক্যাটাগরিতে পড়ে।

(৪) বাই (Bisexuality) : একটি ছেলে বা একটি মেয়ে, সে অপর কোনো ছেলে বা মেয়ে উভয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। একটি ছেলে যে মেয়েদের প্রেমেও পড়ে আবার ছেলেদের প্রেমেও পড়ে। পর্নস্টার সানি লিওন বাইসেক্সচুয়াল।

সমকামিতা (Homosexuality) একটি যৌন অভিমুখিতা, যার দ্বারা সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি যৌন আকর্ষণ বোঝায়। এইরূপ আকর্ষণের কারণে এক লিঙ্গের মানুষের মধ্যে যৌনসম্পর্ক ঘটতে পারে। প্রবৃত্তি হিসেবে সমকামিতা বলতে বোঝায় মূলত সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি “স্নেহ বা প্রণয়ঘটিত এক ধরনের যৌন প্রবণতা”। এই ধরনের সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত বা সামাজিক পরিচিতি, এই ধরনের আচরণ এবং সমজাতীয় ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত কোনো সম্প্রদায়কেও এই শব্দটি দ্বারা নির্দেশ করা হয়।

উভকামিতা ও বিপরীতকামিতার সাথে সমকামিতা বিপরীতকামী-সমকামী অনবচ্ছেদের অন্তর্গত যৌন অভিমুখিতার তিনটি প্রধান ভাগের অন্যতম বলে স্বীকৃত। ব্যক্তির মনে কেমন করে কোনো নির্দিষ্ট যৌন অভিমুখিতার সঞ্চার হয় সেই ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতৈক্য নেই। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন জিনগত, হরমোনগত এবং পরিবেশগত কারণ একত্রে যৌন অভিমুখিতা নির্ধারণের জন্য দায়ী। জীববিদ্যানির্ভর কারণগুলিকে বেশি সমর্থন করা হয়। এর অন্তর্গত হল জিন, ভ্রূণের ক্রমপরিণতি, এই দুই প্রভাবের মেলবন্ধন অথবা এই সব কিছুর সঙ্গে সামাজিক প্রভাবের মেলবন্ধন। যৌন-অভিমুখিতা নির্ধারণে যে সন্তানপালন বা শৈশবের অভিজ্ঞতার কোনো ভূমিকা আছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আচরণের প্রভাবক হিসাবে এক পরিবেশে থাকার ভূমিকা মহিলাদের ক্ষেত্রে নগণ্য এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে শূন্য। কেউ কেউ সমকামী যৌনাচরণকে অপ্রাকৃতিক মনে করলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা গেছে সমকামিতা মানব যৌনতার একটি সাধারণ ও প্রাকৃতিক প্রকার মাত্র এবং অন্য কোনো প্রভাবকের অস্তিত্ব ছাড়া এটি মনের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। অধিকাংশ মানুষের অভিজ্ঞতায় যৌনতার ব্যাপারে সচেতন পছন্দের কোনো ভূমিকা থাকে না। যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের বিভিন্ন কর্মসূচির কার্যকারিতা সম্পর্কে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

নানা কারণে স্বঘোষিত সমকামীর সংখ্যা এবং মোট জনসংখ্যার মধ্যে সমলৈঙ্গিক সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষের অনুপাত নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। এই কারণগুলোর মধ্যে প্রধান হল সমকামভীতিজনিত বৈষম্যের কারণে অনেক সমকামীর প্রকাশ্যে তাঁদের যৌনতা না স্বীকার করা। অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও সমকামী আচরণের নিদর্শন নথিভুক্ত হয়েছে। অনেক সমকামী মানুষ স্থায়ী পারস্পরিক সম্পর্কে আবদ্ধ আছেন, যদিও আদমশুমারির ফর্ম, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদির আনুকূল্যে তাঁদের আত্মপ্রকাশের পথ নিরাপদ হয়েছে একেবারে সাম্প্রতিক কালে। মূল মনস্তাত্ত্বিক গঠনের দিক দিয়ে এই সম্পর্কগুলি বিষমকামী সম্পর্কের সমান। নথিভুক্ত ইতিহাস জুড়ে সমকামী সম্পর্ক এবং কার্যকলাপের প্রশস্তি ও নিন্দা — উভয়েরই নিদর্শন মেলে, কেবল প্রকাশের ভঙ্গিমা ও সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিজনিত তারতম্য দেখা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়েছে, যার অন্তর্গত বিবাহ, দত্তক গ্রহণ ও সন্তানপালন, কর্মক্ষেত্রে সমানাধিকার, সামরিক পরিষেবা, স্বাস্থ্য পরিষেবায় সমানাধিকার, এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সমকামীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অ্যান্টি-বুলিং আইন। বর্তমানে হোমোসেক্সুয়াল শব্দটি বিদ্বৎসমাজে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হলেও ‘গে’ এবং ‘লেসবিয়ান’ শব্দদুটি অধিক জনপ্রিয়। ‘গে’ শব্দটির দ্বারা পুরুষ সমকামীদের বোঝানো হয় এবং নারী সমকামীদেরকে বোঝানো হয় ‘লেসবিয়ান’ শব্দটির দ্বারা। পশ্চিমে ‘গে’ শব্দটি সমকামী অর্থে প্রথম ব্যবহৃত হতে দেখা যায় সম্ভবত ১৯২০ সালে। তবে সে সময় এটির ব্যবহার একেবারেই সমকামীদের নিজস্ব গোত্রভুক্ত ছিল। মুদ্রিত প্রকাশনায় শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হতে দেখা যায় ১৯৪৭ সালে। লিসা বেন নামে এক হলিউড সেক্রেটারি “Vice Versa: America’s Gayest Magazine” নামের একটি পত্রিকা প্রকাশের সময় সমকামিতার প্রতিশব্দ হিসেবে ‘গে’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সমকামী দেশ হল অস্ট্রেলিয়া। এদেশে সমকামীদের অধিকার রক্ষায় কড়া আইন আছে। এখানকার সমকামীদের কেউ কটুক্তি করলে সোজা শ্রীঘর। ইউরোপ-আমেরিকাতে সমকামিতা থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার মতো এতটা অধিকার তারা পায় না। সমগ্র পৃথিবীতে থেকে অনেক সমকামী প্রতি বছর স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসে। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্যও সমকামীরা বিশেষ অগ্রাধিকার পায় এদেশে। প্রতি বছর মার্চ মাসে অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুস্টানের মতো ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানে সমকামী অর্ধনগ্ন র‌্যালি হয় রাস্তায়। আইনের ভয়ে সমকামিতাকে খারাপ বলার সাহস হয় না কারোর। এখানকার মা-বাবা প্রার্থনা করে যেন তার সন্তান সমকামী না-হয়। সমকামী হয়ে গেলে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এদেশের আইন তাদের দেয়নি। অলিম্পিকের অয়োজক দেশ যেভাবে প্রচুর টাকা আয় করে, ঠিক তেমনি অস্ট্রেলিয়া প্রতি বছর প্রায় একই পরিমাণ টাকা সমকামিতাদের সমর্থন করে আয় করে। সমকামী বার, সমকামী ক্লাব, সমকামী র‌্যালি, প্রতি বছর কয়েক হাজার ধনী সমকামী স্থায়ী ভাবে বসবাস করার জন্য তাদের নিজেদের দেশের সমস্ত সম্পদ নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসে । সমকামিতা এই দেশের সরকারের বড়ো এক আয়ের উতস। অনেকে মনে করেন যে কয়টি দেশে সমকামিতা বৈধ, সব দেশেই ব্যাবসার জন্য সমকামিতা বৈধ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে দামি গাড়ি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমকামীদের কাছেই দেখা যায়। উন্নত বিশ্বে ধনী লোকেরা সমকামী হওয়াতে মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি, চিকিৎসক, বিখ্যাত ব্যক্তি এমনকি সরকারও তাদেরকে মানসিক রোগী বা ফ্যান্টাসি বাতিক বলতে পারছে না। বরং তাদের এই সমকামিতাকে সমর্থন করলে বিরাট ব্যাবসায়িক লাভ আছে।

অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, ভোগবাদে সমকামিতা একটি পণ্য, অপরদিকে পশুপাখির আচরণের ধারাবাহিকতায় বিরাজমান একটি শখ ! ১৩০ টার মতো পাখির মধ্যে (এর মধ্যে লেইসান আলবাট্রসের ৩১% এর মধ্যে মেয়ে-মেয়ে ও গ্রেলাগ গিজ এর ২০% এর মধ্যে ছেলে-ছেলে) সমকামিতার প্রধান কারণ প্যারেন্টিং-এর চাহিদা কম থাকা। পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধহীনতা বা এককথায় অসামাজিকতা সমকামিতাকে শখে পরিণত করে। যুক্তরাজ্যের এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভলুশনারি জেনেটিসিস্ট অ্যালান ম্যুর মানুষের সমকামিতাকেও সেভাবেই দেখেছেন। ইস্টার্ন সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত “Federal distortion of the homosexual footprint” এ ড: পল ক্যামেরুন দেখিয়েছেন পুরুষ ও মেয়ের বিবাহসম্পর্ক আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দেয় যেখানে সমকামীদের ক্ষেত্রে আয়ুষ্কাল ২৪ বছর কম। পল ক্যামেরুন ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল, কানাডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল, পোস্ট-গ্রাজুয়েট মেডিক্যাল জার্নালের সম্পাদনা করে থাকেন। তার নিজের ৪০ টার মতো আর্টিকেল আছে সমকামিতার উপর। ১৯৯০ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে ডেনমাকর্কে স্বাভাবিক যৌনাচারীর গড় আয়ু যেখানে পাওয়া গেছে ৭৪, সেখানে ৫৬১ গে পার্টনার এর গড় আয়ু পাওয়া যায় ৫১ ! সমকামী মহিলাদের ক্ষেত্রেও এই গড় আয়ুর হার কম, আনুমানিক ২০ বছর কম! অপরদিকে ধুমপায়ীদের ক্ষেত্রে এই আয়ুষ্কাল কমে যাবার হার মাত্র ১ থেকে ৭ বছর!

১৯৭৩ সালের আগে পর্যন্ত একে মানসিক অসুস্থতা হিসাবেই দেখা হত। পরে অবশ্য ১৯৭৩ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন সমকামিতাকে মানসিক অসুস্থতা থেকে অব্যহতি দেয়। অনেকে মনে করেন সমকামিতা একটি  অত্যাধিক ভোগবাদিতার উপকরণ। তা ছাড়া পরিস্থিতিও এর বিকাশ ও পরিপুষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী। স্বাভাবিক যৌনসম্ভোগের উপায় না-থাকলে সমকামিতা হয়ে উঠে অপরিহার্য  যৌনাচার। সেজন্যই সৈনিকদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করার মতো। ইউএলসিএ-এর আইন স্কুলের উইলিয়াম ইনস্টিটিউটের গবেষণালব্ধ ফলাফলে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে আনুমানিক ৬৬,০০০ সমকামী ও উভকামী আছে। ২০০৯ সালের গ্যালপ জরিপেও জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের ৬৯% লোক সমাকামীদের সেনাবাহিনীতে কাজ করাকে সমর্থন করে। ইংল্যান্ডের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী রবিন ডানবার মনে করেন, যুদ্ধ ও শিকারে সমকামিতা পুরুষ গোত্রকে সংগঠিত রাখতে সাহায্য করে। প্রাচীন গ্রিসে স্পার্টানদের এলিট সৈন্যদের মধ্যে সমকামিতাকে উৎসাহিত করা হত। গ্রিক স্পার্টান ছাড়াও অন্য থেবেস, এথেন্সেও সমকামিতার উদাহরণ পাওয়া যায়।

সেক্স বিষয়টি পুরোপুরি শরীরের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু জেন্ডার নির্ভরশীল সমাজের উপর। যেহেতু নারী বা পুরুষের দায়িত্ব, কাজ ও আচরণ মোটামুটি সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত হয়, তাই সমাজ পরিবর্তন বা সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জেন্ডার ধারণা বদলে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, আমরা যখন কারোকে ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ হিসাবে চিহ্নিত করি তখন সেখানে জৈবলিঙ্গ নির্দেশ করাটাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ‘মেয়েলি’ বা ‘পুরুষালি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে জেন্ডার প্রপঞ্চকে যুক্ত করা হয় যেখানে, সেখানে নারী বা পুরুষের লিঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে স্বভাব-আচরণগত ইত্যাদি বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। আর এই কারণেই সেক্সকে জৈবলিঙ্গ এবং জেন্ডারকে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক লিঙ্গ বলে অনেকে অভিহিত করেন। মানবসভ্যতার বিভিন্ন সমাজব্যবস্থায় লিখিত ইতিহাসের সমগ্র সময়কাল জুড়ে রূপান্তরকামিতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে আমেরিকার পুরুষ রূপান্তরকামী জর্জ জরগেন্সেনের ক্রিস্টিন জরগেন্সেনের রূপান্তরিত হওয়ার কাহিনি মিডিয়ায় এক সময় আলোড়ন তুলেছিল। এ ছাড়া জোয়ান অব আর্ক, জীববিজ্ঞানী জোয়ান (জনাথন) রাফগার্ডেন, বাস্কেটবল খেলোয়াড় ডেনিস রডম্যান, চক্ষুচিকিৎসক এবং পেশাদার টেনিস খেলোয়ার ডঃ রেনি রিচার্ডস, সঙ্গিতজ্ঞ বিলিটিপটন সহ অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তির মধ্যে রূপান্তরপ্রবণতার উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়। ১৯৬০ সালে মনোচিকিৎসক ওয়ালিন্দার রূপান্তরকামীদের উপরে একটি সমীক্ষা চালান। তার এই সমীক্ষা থেকে জানা যায়, প্রতি ৩৭,০০০-এ একজন পুরুষ রূপান্তরকামীর জন্ম হচ্ছে, অপরদিকে প্রতি ১০৩,০০০-এ একজন স্ত্রী রূপান্তরকামীর জন্ম হচ্ছে। ইংল্যান্ডে এই সমীক্ষাটি চালিয়ে দেখা গেছে যে সেখানে প্রতি ৩৪,০০০-এ একজন পুরুষ রূপান্তরকামী ভূমিষ্ঠ হচ্ছে, আর অন্যদিকে প্রতি ১০৮,০০০-এ একজন জন্ম নিচ্ছে একজন স্ত্রী রূপান্তরকামী। অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে সেখানে ২৪,০০০ পুরুষের মধ্যে ১ জন এবং ১৫০,০০০ নারীর মধ্যে ১ জন রূপান্তরকামীর জন্ম হয়।

বিপরীতকামী-সমকামী অনবচ্ছেদ অনুসারে যৌন অভিমুখিতার প্রধান তিনটি বর্গের অন্যতম হল সমকামিতা (অপর বর্গদুটি হল উভকামিতা ও বিপরীতকামিতা)। বিভিন্ন কারণে গবেষকেরা সমকামী রূপে চিহ্নিত ব্যক্তির সংখ্যা বা সমলৈঙ্গিক যৌন সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের অনুপাত নির্ধারণ করতে সক্ষম হননি। আধুনিক পাশ্চাত্য জগতে বিভিন্ন প্রধান গবেষণার ফলে অনুমিত হয় সমকামী বা সমলৈঙ্গিক প্রণয় ও রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মোট জনসংখ্যার ২% থেকে ১৩%। ২০০৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, জনসংখ্যার ২০% নাম প্রকাশ না-করে নিজেদের মধ্যে সমকামী অনুভূতির কথা স্বীকার করেছেন। যদিও এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে খুব অল্পজনই নিজেদের সরাসরি সমকামীরূপে চিহ্নিত করেন।

পথেঘাটে-বেশ্যাপাড়ায় বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পুরুষ যৌনকর্মীর দেখা মেলে।এই পুরুষ যৌনকর্মীরা বেশিরভাগই হয় রূপান্তকামী, না-হয় সমকামী। এদের মানসিকতা কিন্তু আলাদা। যৌন-অনুভূতিও আলাদা। পুরুষের খোলস ছেড়ে যাদের পরিপূর্ণ নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার বাসনা জাগে, তারাই রূপান্তরকামী বা যৌন পরিবর্তনকামী ( Transsexual)। নারীরাও এই ধরনের মানসিকতার হতে পারে। অর্থাৎ নারীর খোলস ছেড়ে পরিপূর্ণ পুরুষে রূপান্তরিত হওয়ার বাসনা জাগে।এরা লিঙ্গ ছেদন করতে চায় না।রূপান্তরকামীদের পাশাপাশি আছে সমকামিতা বা Homosexuality। এই দুই মানসিকতার মধ্যে মিল যেমন আছে, তেমনি অমিলও প্রচুর। সব রূপান্তরকামীই সমকামী, কিন্তু সব সমকামীরাই রূপান্তরকামী নয় সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও সমকামীরা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করে না। সমকামী সম্পর্কে আবদ্ধ দুই সম ব্যক্তি একজন পুরুষের মতো সক্রিয় (Active), অপরজন নারীদের মতো নিষ্ক্রিয় (Passive) ভূমিকা পালন করে, যৌনমিলনের ক্ষেত্রে।যদিও বিষমকামীদের ক্ষেত্রে নারীরা কখনো-সখনো যৌনমিলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে, তা সত্ত্বেও সমকামীদের যৌন-ভূমিকাটা বোঝানোর জন্য সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় প্রসঙ্গটা উঠে এসেছে। রূপান্তকামিতা এবং সমকামিতা – এই দুই ধরনের মানসিকতা যে শুধুমাত্র শৈশব ও কৈশোরেই দেখা দেবে এমন নয়, পরিণত বয়সেও ধীরে ধীরে সমকামী মানসিকতার জন্ম নিতে পারে।

পর্নোছবিতে রূপান্তরকামীদের প্রচুর পরিমাণে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। এদের যেমন সতেজ এবং প্রমাণ মাপের লিঙ্গ আছে, তেমনি স্বাভাবিক নারীদের চাইতে বেশি সুডৌল-নিটোল স্তনও থাকে। এরা টু ইন ওয়ান। অর্থাৎ এরা কখনো পুরুষের ভূমিকা নিয়ে পুরুষের পায়ুপথে লিঙ্গ প্রবেশ ঘটায়, কখনো-বা নারী হয়ে অন্য পুরুষের লিঙ্গ পায়ুপথে গ্রহণ করে। পর্নোছবিতে এইসব “Shemale” বা “Ladyboy”-দের দাপট লক্ষ করার মতো।

হিজড়াদের মধ্যে যারা যৌনকর্মী তাদের ‘ধুরানি’বলা হয়।হিজড়াজগতে ‘ধুরানি’ বলতে ‘নারী’ যৌনকর্মীকেই বোঝায়।যাই হোক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা অনুসারে ধুরানিদের চারভাগে ভাগ করা হয়। যেমন – (১) খানদান ধুরানি (অত্যন্ত ধনী পরিবারের রূপান্তরকামীও সমকামী পুরুষরা খানদান ধুরানি হয়ে আছে। পুরুষের সান্নিধ্য ও যৌনসুখের আকর্ষণেই এরা এই পথে আসে), (২) লহরি ধুরানি (এরা সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই আসে। এরা যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ। পুরুষ সঙ্গলাভের আশায় এরাও এই পেশা গ্রহণ করেছে।), (৩) আদত ধুরানি (দত ধুরান হল সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীদের একেবারে তলানি। খোলা আকাশের নীচে পলিথিন বিছিয়ে এরা খরিদ্দারদের তৃপ্ত করে। )এবং (৪) আকুয়া ধুরানি (স্বেচ্ছায় পুরুষাঙ্গ কর্তন করে হিজড়া সেজেছে এরা। এরা যৌন পরিবর্তনকামী।)। এরা সকলেই সমকাম করে। আসলে হিজড়া দলের একটা বড়ো অংশই হল হয় রূপান্তরকামী, নয় সমকামী।এরা পায়ুকামের (Anal Sex) মাধ্যমেই যৌনক্রিয়া করে।তবে পায়ুমৈথুন ছাড়াও মুখমেহন (Oral Sex) এবং সঙ্গীর ঊরুদ্বয়ে লিঙ্গস্থাপন (Irtra Crusal Sex) করেও যৌনসঙ্গম করে।

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় পায়ুধর্ষণের (Anal Rape) কোনো কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু ৩৭৭ ধারায় পায়ুকামের কথা উল্লেখ আছে। পায়ুকামকে ৩৭৭ ধারায় প্রকৃতি-বিরুদ্ধ যৌন-আচরণ (Carnal intercourse against the order of nature) হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।পায়ুকাম এবং পায়ুধর্ষণের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা টানা হয়নি। আইনে বলা হয়েছে – “In this crime question of consent has no value. Both the active and passive agents will be punished even when the act has been done with the consent of the passive agent”(J. B. Mukherjeee). এখানেই শেষ নয়, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার আরও একটি বিষয় হল ‘মুখমৈথুন’ (Oral Sex), এটি আইনত দণ্ডনীয়। এক্ষেত্রে সমকাম ও বিষমকাম হিসাবে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ আইনে দেওয়া হয়নি। অথচ ভাবুন তো, বর্তমান যুগে মানুষের যৌনজীবনে মুখমৈথুন করে না এমন কাপল খুঁজে পাওয়া অতি দুর্লভ ব্যাপার।বর্তমান কেন বলছি, প্রাচীন যুগে খাজুরাহো মন্দিরে লক্ষ করুন, সেখানে মুখমৈথুনের মুর্তি দেখা মিলবে।সঙ্গী পুরুষই হোক বা নারীই হোক, শিশ্ন বা লিঙ্গ যদি তার মুখে স্থাপন করা হয়, তবে তা পায়ুকামের সমান অপরাধ।এই বিশেষ যৌনক্রিয়াকে ফেলাসিয়ো (Fellatio) বলে। আইে ফেলাসিয়ো অপরাধ হলেও যোনিতে মুখস্থাপন বিষয়ে আইন এক্কেবারে চুপ।বাৎসায়নের ‘কামশাস্ত্রম্’-এও মুখমৈথুনের উল্লেখ আছে। তাহলে কোন্ যুক্তিতে মুখমৈথুন এবং মুখমেহন দণ্ডনীয় অপরাধ হবে ?

সমকামিতাকে অপরাধ বলেই গণ্য করতে বলল সুপ্রিম কোর্ট (১১ ডিসেম্বর, ২০১৩)। সর্বোচ্চ আদালত জানায়, ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামিতা দণ্ডনীয় অপরাধ। যতক্ষণ-না সংসদ আইন করে এই ধারা লোপ করছে ততক্ষণ সমকামিতা আইনত অপরাধই থাকছে। এর আগে ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, ভারতীয় দন্ডবিধির এই ধারাটি বৈষম্যমূলক এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়ের সুবাদেই সমকামী এবং রূপান্তরকামীরা তাঁদের অধিকার অর্জনের পথে এগিয়েছিলেন বলে দাবি করতেন। সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্য সেই এলজিবিটি আন্দোলনকারীদের পক্ষে বড়ো ধাক্কা। শীর্ষ আদালতের বেঞ্চের বক্তব্য — “৩৭৭ ধারা বাতিল নয়। ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী সমকামিতা দণ্ডনীয় অপরাধ, সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন পর্যন্ত।”

প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সঙ্গে, প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করে সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যে-কোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে -– যার মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে — দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে। এই ধারায় অস্বাভাবিক অপরাধের শাস্তির বিধান করা হয়েছে এবং তা অবশ্য প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধভাবে হতে হবে। যদিও প্রাকৃতিক নিয়ম বিরুদ্ধ যৌন সহবাসের সর্বজনীন স্বীকৃত সংজ্ঞা এখনও নির্ণীত হয়নি।

দেশে দেশে সমকামী ও সমকামীদের আইনি অবস্থান, আসুন দেখে নিই। @ বৈধ : ইজরায়েল , শ্রীলঙ্কা , চিন , জাপান , উত্তর কোরিয়া , দক্ষিণ কোরিয়া , থাইল্যান্ড , ভিয়েতনাম , ফিলিপিন্স @ অবৈধ : ভুটান ,নেপাল , মায়ানমার @ মহিলা সম্পর্ক বৈধ : সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আমেরিকা, গায়ানা ছাড়া স্বীকৃতি সর্বত্র অস্ট্রেলিয়া মাইক্রোনেশিয়া ও মেলানেশিয়ার কয়েকটি দেশ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সহ সর্বত্রই বৈধ @ আফ্রিকা বৈধ : মাদাগাস্কার, দক্ষিণ আফ্রিকা, @ অবৈধ : কেনিয়া @ মহিলা সম্পর্ক বৈধ : মরিশাস , সেশেলস , জিম্বাবোয়ে ইউরোপ বৈধতা সব দেশেই উত্তর আমেরিকাকয়েকটি ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্র ছাড়া উত্তর আমেরিকার সর্বত্রই সমকামিতা বৈধ । @ বৈধ : ইরাক , বাহরিনে (স্বীকৃতি ন্যূনতম ২১ বছরের সমকামী সম্পর্কে, যদি দু’জনেই সহমত হন ) @ যৌনসঙ্গম বেআইনি নয় : আলবানিয়া , তুরস্ক , জর্ডন , ইন্দোনেশিয়া ও মালি @ সমকাম প্রকৃতি-বিরুদ্ধ , অবৈধ , বেআইনি৷ অতএব অপরাধ৷ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বৈধ৷ @ মুসলিম বিশ্বে নারী সমকামিতাকে স্বীকৃতি : কুয়েত অধিকারের স্বার্থে লড়াই জারি : লেবানন @ মৃত্যুদণ্ড : সৌদি আরব , লিবিয়া , সুদান , ইরান , আফগানিস্তান , নাইজেরিয়া , ইয়েমেন @ জেল ও জরিমানা : পাকিস্তান (ন্যূনতম দু-বছর থেকে যাবজ্জীবন), বাংলাদেশ (ন্যূনতম দশ বছর থেকে যাবজ্জীবন ), কাতার , আলজিরিয়া , উজবেকিস্তান , মলদ্বীপ , সিরিয়া , মালয়েশিয়া , মিশর। @ ১৯৭৯ -এর ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানে সমকামিতার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রান্তের সংখ্যা কমপক্ষে ৪ ,০০০৷

পরিশেষে বলব – সাধারণ মানুষের কাছে এরা প্রান্তিক, এরা হিজড়া অথবা সমকামী। তাই এদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাজনিত উৎকণ্ঠা ও উদবেগ খুব সাধারণভাবেই লক্ষ করা যায়। দ্বৈতসত্ত্বার টানাপোড়েনে খোজারা জর্জরিত। এদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা যেমন প্রকট, তেমনি হীনমন্যতা কুরে কুরে খায়।বেশিরভাগ খোজাই যেহেতু পরিস্থিতির চাপে লিঙ্গ কর্তন করে হিজড়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দা হয়, তাই তারা এ জীবন সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। উৎকণ্ঠা চেপে ধরে ক্রমাগত, প্রতি মুহূর্ত। হিজড়ারা মূলত সমকামী – একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, সুস্থ যৌনজীবনে এরা অক্ষম বলেই সমকামী মানসিকতার শিকার। সেই কারণেই তথাকথিত পরিশীলিত সমাজের মানুষেরা এদের নারীর বিকল্প হিসাবে ভাবে। এই উপেক্ষিত হিজড়ারা মূলস্রোতের মানুষদের কাছ থেকে স্নেহ-ভালোবাসা-সম্মান পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। বিনিময়ে মূলস্রোতের মানুষেরা এদেরকে কৌতুকের বস্তু মনে করে, হিজড়া আর জোকার যেন সমার্থক। তার উপর এদের সম্বন্ধে বিপুল অজ্ঞতার কারণে দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আর এই অজ্ঞতার ফলেই এদের নিয়ে চটুল রসিকতা। ছেলেছোকারা এদের দেখলেই “এই আমারটা একটু চুষে দিবি ?” বলে লেগপুলিং করে। এদেরকে মানবিক আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে দেখার কথা কেউ ভাবতে পারে না। নানা রকমের কটুক্তি, কু-ইঙ্গিতের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষ এদের উত্যক্ত করে, উত্তেজিত করে। সমাজের অনেকেই হিজড়াদের ‘অশুভ শক্তি’ ভাবে। আবার কেউ কেউ অশুভ বা অপয়া তো নয়ই, উলটে শুভ বা পয়া ভাবে। কারোর কারোর মধ্যে হিজড়াদের শ্রদ্ধা করার রেওয়াজও আছে।

সারা পৃথিবীতে (বিশেষ করে ভারতে) উভলিঙ্গ মানবদের প্রাপ্য অধিকার ও মানুষ হিসাবে পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ আইনের খুব প্রয়োজন, সনাতন লৈঙ্গিক বলয় ভাঙারও প্রয়োজন। ঘৃণা নয়, অবজ্ঞা নয় – শুধু মানুষ পাক মানুষের সম্মান। সার্বিক উন্নতির জোয়ারে প্লাবিত হলেও আমরা এখনও পুরোপুরি বিজ্ঞানমনষ্ক হয়ে উঠতে পারিনি। আমাদের দেশে এখনও সমকামিতা নিষিদ্ধ বিধায় হিজড়েদের যৌনজীবন অপ্রতিষ্ঠিত। ভাবলে তখন অবাক লাগে যখন দেখছি মানুষের যৌনজীবনে রাষ্ট্র নাক গলায়। একটা রাষ্ট্র বলে দেবে একজন মানুষ কীভাবে, কখন যৌনমিলন করবে ? একটা রাষ্ট্র বলে দেবে একজন মানুষ যৌনসঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে কীরকম যৌনাচরণ করবে ? রাষ্ট্র বলে দেবে কে মুখমৈথুন করবে, কে পায়ুমৈথুন, কে উরুমৈথুন করবে, কে স্তনমৈথুন করবে, কে জননাঙ্গমৈথুন করবে ? এসব কি রাষ্ট্রের বলার অপেক্ষায় থাকে নাকি মানুষ ? রাষ্ট্র সেখানেই নাক গলাতে পারে যেখানে যৌনমিলনের নামে অত্যাচার চলে। যদি যৌনসঙ্গীর কেউ একজন তেমন অভিযোগ করে যে তাঁকে দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বিশেষ যৌনাচরণে বাধ্য করাচ্ছে। তা সে সমকামীদের ক্ষেত্রেই হোক, কিংবা বিসমকামী।এই যে সমকামীরা লোক দেখা নেই জন দেখা নেই যাকে-তাকে সমকাম করার জন্য বিরক্ত করে মারে – এটা অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া উচিত। সাধারণ নারী-পুরুষের যৌনতা সংক্রান্ত দণ্ডবিধিতে যেমন শাস্তির বিধান আছে। তাই বলে সমকামকে স্বীকৃতি দিলে পায়ুমৈথুনকে স্বীকৃতি দিতে হবে, সেই কারণে সমকাম নিষিদ্ধ – এ যুক্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সমকাম এবং সমকামীদের স্বীকৃতি দিলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে ? স্বীকৃতি দিলে পৃথিবীর সকলে লাইন দিয়ে সমকামী হয়ে যাবে ? যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই পৃথিবীর সকলে সমকামী হয়ে যাবে, তাতে কার কী এসে যাবে ? সূর্য কি পশ্চিমদিক থেকে উঠতে শুরু করে দেবে ? সন্তানের জন্ম ? বিসমকামীদের মধ্যে কত হাজার হাজার দম্পতি সন্তানের জন্ম দিতে অপারগ, সে কারণে কি পৃথিবী রসাতলে চলে গেছে ? খুবই অবাক লাগে মানুষের ব্যক্তিগত গণ্ডীর কামনা-বাসনা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে থাকে এবং তাদের স্বীকৃতির অপেক্ষায় ধুকে ধুকে মরে। চিলেকোঠার খাঁচায় ডানায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে যেই পাখিটি এখনও কাতরাচ্ছে সেও স্বপ্ন বুনে আকাশে পুনরায় ডানা মেলার। তারও পূর্ণ অধিকার আছে ফিরে যাওয়ার তার জগতে। লাঞ্ছনা, বঞ্চনার জগত থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও অস্তিত্বের বৈধতার সংগ্রাম করে চলছে বৃহন্নলারা। হাজার হাজার শিখণ্ডী চোখের দ্যুতির মাঝে স্বপ্ন লালন করে চলছে সম্মান ও সমৃদ্ধির জীবনের।

আজ অনিবার্য হয়ে উঠেছে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মানবিক দাবিটাও। রূপান্তরী মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরিস্থলে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসাবে আইডেন্টটি করেছেন। ৩৭৭ নম্বর ধারার কবলে পড়ে আমার যে সমস্ত ভাই-বোন-বন্ধুরা যৌন-অবদমিত হয়ে বন্দিদশায় দিন কাটাচ্ছেন আমি বিসমকামী হয়েও তাদের পাশে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করি। তাদের যন্ত্রণা আমি উপলব্ধি করি। আমি তাদের যৌনভাবনাকে সম্মান করি, সমর্থনও করি। কারণ আমি মনে করি ওদের যৌনচেতনা প্রাকৃতিকই। যৌন-প্যাশানে আমাদের মতো তো নিশ্চয় নয়, ওদের মতো তো বটেই ! ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সমকামীদের দাবি অন্যায্য বলেছেন। বস্তুত সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ৷ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরে এ ভাবে ঢুকে পড়ার অধিকার বিচারব্যবস্থারও থাকতে পারে নাকি৷ প্রান্তবয়স্ক দুজন মানুষ তাদের যৌনজীবনে কী কী স্বাধীনতা নেবেন সে ব্যাপারে কেন মন্তব্য করবে আদালত ? তাদের মতো করে যৌনতা করলে সমকামীদের শাস্তি দেওয়া হবে ? একজন পুরুষ নারীকে আদর না-করে কোনো পুরুষকে আদর করলে কিংবা একজন নারী যদি পুরুষকে আদর না করে কোনো নারীকে আদর করে, তবে তাদের জেল দিতে হবে ? এটা কেমনতর অপরাধ ! এর বিরুদ্ধে শুধু সমকামীরা নয় , প্রতিবাদ করা উচিত সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের। আইনি বিশেষজ্ঞেরা স্পষ্টই বলছেন , সংবিধানের ১৪ , ১৫ ও ২১ ধারা ব্যক্তি মানুষের যে সমানাধিকার ও স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তার পরিপন্থী৷’ এটা তো একটা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়৷ সেই পছন্দ তো অন্য কেউ করে দিতে পারে না৷ তবে হ্যাঁ, শুধু সৃষ্টি অর্থাৎ সন্তানধারণই যদি হয় ভালোবাসার সংজ্ঞা হয়, তা হলে তো অনেক কিছুই অস্বাভাবিক৷ শীর্ষ আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির যে ধারাকে সাংবিধানিক বলে বহাল রেখেছে , তা কেবল মাত্র পুরুষ বা নারীর সমকামিতার কথা বলে না৷ সেখানে বিসমকামিতার কথাও বলা আছে৷ সে ক্ষেত্রে ওরাল সেক্স ও অ্যানাল সেক্সও কিন্ত্ত অপরাধযোগ্য৷ কারণ তাতে সৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই৷ তাই ভালোবাসা বা প্রেমের একমাত্রিক অভিমুখের বাইরে কিন্ত্ত দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা ভাবছেন না৷

১৬৩ বছর আগে ব্রিটিশ ভারত একে অপরাধ বলে গণ্য করেছিল৷ তার আগে পর্যন্ত কিন্ত্ত সমকামিতা নিয়ে ভারতীয় সমাজে সেভাবে কোনও হেলদোল ছিল না৷ প্রাচীন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারত যেখানে চিন্তার দিক থেকে এতটা অগ্রসর ছিল, তা হলে একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে কেন সুপ্রিম কোর্টের এহেন রায় ? কেন পুরুষের সঙ্গে পুরুষ বা মহিলার সঙ্গে মহিলার সম্পর্ককে এখনও ‘প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধাচারণ’ ভাবা হচ্ছে ? সুপ্রিম কোর্টের রায় বলছে — তারা ভরসা করেছে ১৮৬০ সালের মেকলের ব্যাখ্যাকেই৷ তিনি বলেছিলেন , ‘যৌনতা সৃষ্টির জন্য, কোনও বিনোদনের জন্য নয়৷ এ ধরনের সম্পর্ক থেকে কোনও সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই৷ কাজেই এই সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়৷ শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷’ তার মানে সৃষ্টি হয়ে গেলে যৌনমিলন বন্ধ দেওয়া উচিত, তাই নয় কি ? কন্ডোম বা অন্যান্য পিল ব্যবহার করে যৌনমিলন করার উদ্দেশ্য তো বিনোদনই।
পাঠক ভালো করে লক্ষ করুন এই লাইনটি – “যৌনতা সৃষ্টির জন্য, কোনও বিনোদনের জন্য নয়৷ এ ধরনের সম্পর্ক থেকে কোনও সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই৷  কাজেই এই সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়”৷ যৌনতা  সৃষ্টির জন্য ? কবে থেকে ? বাজারে, থুড়ি আমাদের মনুষ্যসমাজে এমন একটা কথা চালু আছে বইকি। আমিও শুনেছি। হিপোক্রাসি, জাস্ট হিপোক্রাসি। ভণ্ডামি। দেখো, আমরা মানবজাতি কী মহান উদ্দেশ্যই-না যৌনক্রীড়া করি, এটা বোঝাতেই বোধহয়  এই গপ্পো সমাজে ছড়িয়ে আছে। যখন বা যেদিন  যে আদি মানব-মানবীটি প্রথম যৌনক্রীড়া করেছিল সেটাই তো ছিল স্রেফ যৌনতাড়না। ওরা সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করেছে বলে কোথাও উল্লেখ পাইনি। শিবপুরাণে শিব-পার্বতীর যে দীর্ঘ সময় একটানা যৌনক্রীড়ার বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে কোনো সৃষ্টির কাহিনি বর্ণিত নেই। বরং সৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে যাবে এই আতঙ্কে স্বয়ং বিষ্ণু  শিব-পার্বতীর বেডরুমে শুকপাখিকে পাঠিয়ে দেয় তাদের যৌনক্রীড়া ঘেটে দেওয়ার জন্য।

বিসমকামীরা যদি বলেন তারা শুধুই সৃষ্টির জন্যই যৌনক্রীড়া করেন, তা করুন না। সমকামীদের যৌনতায় যদি কিছু সৃষ্টি না হয় তাতে বিসমকামীদের অসুবিধাটা কোথায় ? ওরা তো কারোর পাকা ধানে মই দিচ্ছে না ! আপনি বা আপনারা বা আদালত বা রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিন বা না-দিন তাতে তো ওদের সৃষ্টিহীন যৌনতা বন্ধ থাকবে না। পৃথিবীও রসাতলে যাবে না – স্বীকৃতি দিলেও না, স্বীকৃতি না-দিলেও না। আপনার পছন্দ নয় বলে তো বিকল্প যৌনতা মিথ্যা হয়ে যাবে না।  আপনার পছন্দ নয় বলে আপনি কোনো একজনের জীবনও বিপন্ন করে তুলতে পারেন না। মনে রাখবেন, বিসমকামীদেরই সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যৌনতার ফলে যে হাজার হাজার সন্তান পিতৃমাতৃপরিচয়হীন হয়ে অনাথ আশ্রমগুলিতে অনাদরে অসহায় হয়ে আছে, প্রয়োজন হলে ওই সমকামী দম্পতি সেইসব সন্তান দত্তক নিয়ে বাবা-মা হওয়ার অহংকারে অহংকারী হবেন। আমিও চাই সমকামী দম্পতিরা সন্তান দত্তক নিয়ে পিতা-মাতার সাধ মেটাক।

সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া, বিনোদনের জন্য নয় – এই বক্তব্যের সমর্থনে কোনো দৃষ্টান্তই আমি উপস্থাপন করতে পারছি না। মানুষ মূলত উচ্ছৃঙ্খল যৌনাচারকে শৃঙ্খলিত-বৈধতা দেওয়ার জন্যই বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি করেছিল। শুধু বৈধ যৌনতাই নয়, সন্তানের পিতৃত্ব নিশ্চিত করতেও বিবাহের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। মানুষ শুধুমাত্র সৃষ্টির জন্যই যৌনতা করে না, করে না-বলেই মানুষের জন্য যৌনক্রীড়ার সময় ৭ X ২৪ X ৩৬৫ দিনই। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না, তাই অনেক অবিবেচক পাষণ্ড মানুষ ঋতুচক্র চলাকালীনও মিলিত হন । সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই গর্ভবতী হয়ে পড়লেও যৌনক্রীড়া বন্ধ করে না। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই অনেকে বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতা করে থাকে। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই অনেক নারী বা পুরুষ একাধিক পুরুষ বা নারীর সঙ্গলাভের প্রত্যাশা করে। মানুষ সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই সারা পৃথিবী জুড়ে পতিতাপল্লি বা পতিতাবৃত্তির এত রমরমা। পতিতাপল্লিতে কেউ নিশ্চয় সৃষ্টি করতে যায় না ! প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজের পাতায় যৌন কেলেঙ্কারীর খবরগুলি আমরা পাই সেগুলি নিশ্চয় সৃষ্টির জন্য বলবেন না। এতো যে ধর্ষণকাণ্ড (জোরপূর্বক যৌনক্রীড়া) ঘটে যায় গোটা পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন কোথাও-না-কোথাও, তা কি সৃষ্টির জন্য ? তবে প্রাচীনকালে নিয়োগ প্রথার মাধ্যমে শুধুমাত্র সন্তান সষ্টির জন্যই যৌনমিলন করতে হত। এটি ছিল বিশেষ শর্তসাপেক্ষ যৌনমিলন। পাণ্ডবের পাঁচজন, কৌরবদের ১০১ জন, কর্ণ, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্ন প্রমুখরা তো নিয়োগ প্রথারই ফসল। এই ব্যতিক্রমী যৌনমিলনগুলি অবশ্যই শুধুমাত্র সৃষ্টির জন্য ছিল। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

একটা মানুষ তার মোট জীবনে (কমবেশি) ১০,০০০ থেকে ১১,০০০ যৌনদিবস (নিশি ?) পান। তার মধ্যে মাত্র ৩০ দিন থেকে ৯০ দিন সৃষ্টির জন্য ব্যয় করেন। বাকি যৌনক্রীড়ার দীর্ঘ দিনগুলি শুধুই যৌনানন্দ বা যৌনবিনোদন বা যৌনসুখের জন্য অতিবাহিত করে থাকে। তাই পাত্র বা পাত্রী যৌনক্রীড়ায় অক্ষম হলে  কোনো ক্ষমা নেই। সোজা ডিভোর্সের মামলা। সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হলে ডিভোর্স হয় কি না আমার জানা নেই, তবে পাত্র বা পাত্রীর যে কেউ একজন যৌনক্রীড়ায় অক্ষম হলে এক লহমায় সম্পর্ক শেষ। যে যুগে মানুষের যৌনক্রীড়া মানেই অনিবার্য সন্তানের জন্ম হত,  সে যুগে মানুষ নিশ্চয় খুব অসহায় ছিল। সেই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জন্ম-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হল। মানুষের সেই অসহায়তা এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সারা পৃথিবী জুড়ে রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেল। বাজারে এখন হাজারটা জন্ম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সুলভে পাওয়া যায়, যার যার সুবিধামতো। এইসব প্রোডাক্টের বিক্রিবাটাও ব্যাপক। এমন কি স্রেফ যৌনসুখ করতে গিয়ে সন্তান যদি এসেও যায়  সমূলে বিনাশ করার তারও ব্যবস্থা পর্যাপ্ত মজুত আছে। সন্তানহীন (পড়ুন সৃষ্টিহীন) যৌনসুখ পেতে মানুষ কি-না করছেন! এরপরেও কেউ যদি বলে সৃষ্টির জন্যই যৌনতা, তাহলে বলব ওসব হিপোক্রাসি ঝেড়ে ফেলে আসুন প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াই। মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হই। ভারত পথ-প্রদর্শক হতে পারত, তার বদলে ভারত এখন ক্রমশ পিছন দিকে এগোতে চাইছে৷ একে চূড়ান্ত ‘পশ্চাদগামী মানসিকতা’ ও ‘লজ্জা’ ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। ভুললে চলবে না — চোখ বন্ধ রাখলে প্রলয় থেমে থাকে না। (সমাপ্ত)

======================================================

তথ্যসূত্র : (১) ব্রহ্মভার্গবপুরাণ – কমল চক্রবর্তী। (২) হলদে গোলাপ – স্বপ্নময় চক্রবর্তী। (৩) Let us live : Social Exclusion of Hijra Community – Sibsankar Mal।(৪) অন্তহীন অন্তরীণ প্রোষিতভর্তৃকা – সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। (৫) ভারতের হিজড়ে সমাজ – অজয় মজুমদার ও নিলয় বসু।(৬) The Truth About Me — A Hijra Life Story — A. Revathi, Penguin। (৭) দেবদাসীতীর্থ – ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়। (৮) অপরাধ জগতে ভাষা ও শব্দকোষ – ভক্তিপ্রসাদ মল্লিক। (৯) হিজড়ে কথা : রক্তমাংসের অসংগতি এবং – পিনি দাসগুহ, উৎস মানুস। (১০) না-পুরুষ, না-মেয়ে মহাভারতের গোপন পর্ব – রমাপ্রসাদ ঘোষাল, প্রতিদিন। (১১) নপুংসক – অনিরুদ্ধ ধর, সানন্দা। (১২) পুরুষ যখন যৌনকর্মী – মজুমদার ও বসু।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Posted in Uncategorised

মার্চ ১০th, ২০১৫ by পটলবাবু

ঠিক খুঁজে নেবো পরীদের
ঠিক বুঝে নেবো প্রশ্রয় – শরীরের,
জল ও যাতনার মাঝে আছে যতো সুখ
আর আছে যতো ভুখ? আদরের!

আজ রাত্রে আমিও দেবতা হবো – বারংবার
এভাবেও দেবতা হওয়া যায়,
এভাবেই দেবতা হওয়া যায়
বিকলন – কোষ ও কামনার।

আর যতো সংলাপ
যাক মুছে অনন্তের ভিড়ে,
বেঁচে থাক পাপ
শরীরে শরীরে।

( বিকলন : integration )

Posted in Uncategorised

ফেব্রুয়ারী ২৫th, ২০১৫ by rajendra

স্যার আইজ্যাক নিউটনকে তো আমরা সবাই চিনি। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে তিনি পদার্থবিদ্যায় অভিকর্ষ ও মহাকর্ষ সম্পর্কিত তত্ত্ব এবং গণিতে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করে বিজ্ঞানকে এক অবিশ্বাস্য গতি প্রদান করেছিলেন। আর সেইজন্য তিনি আজও সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছেন। কিন্তু অনেকেই জানে না যে, তার এই কৃতিত্বের প্রায় পুরোটাই প্রাপ্য ভারতীয় দার্শনিক গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদগনের।

প্রচলিত আছে, একদিন বিকেলে বাগানে বসে থাকার সময় গাছ থেকে একটা আপেল পড়তে দেখে তিনি ভাবনা-চিন্তা শুরু করেন, যার ফলশ্রুতি হলো অভিকর্ষ ও মহাকর্ষ সম্পর্কিত তত্ত্ব ও সূত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিশয় এই যে এই জনশ্রুতি সর্বৈব মিথ্যা। আসলে, তার হাতে এসে পড়েছিল দ্বাদশ শতাব্দির হিন্দু জোতির্বিদ- দার্শনিক দ্বিতীয় ভাস্করাচার্্যে্র একটি গ্রন্থ –‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’ । এই গ্রন্থে তিনি অভিকর্ষ মহাকর্ষ ও ক্যআলকুলাসের আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থের একটি শ্লোকে আছে—
“ আকৃষ্টি শক্তিশ্চ মহীতয়া যৎ
খসৃং গুরু স্বাভিমুখং স্বশক্ত্যা
আকৃষ্যতে তৎ পততীবভাতি
সমে সমস্তাৎ ক্ক পতত্বিয়ং খে !!”
অর্থাৎ, আকর্ষণ শক্তি সম্পন্ন পৃথিবী যখন উপরিস্থিত জড়বস্তুকে আপন শক্তির সাহায্যে নিজের দিকে আকর্ষন করে তখন মনে হয় যে এই সব বস্তু ভুপতিত হচ্ছে। বিভিন্নমুখী শক্তির বলে মহাকাশে পৃথিবীর অবস্থান সুনির্দিষ্ট ।
দ্বিতীয় ভাস্করাচার্য তার এই শ্লোকে দুটি কথা স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন –
প্রথমত, পৃথিবীর আকর্ষন-বল আছে এবং সে সমস্ত উপরিস্থিত বস্তুকে নিজের দিকে টানছে বলেই সেই সব আকর্ষিত বস্তু মাটিতে পড়ছে বলে মনে হয়।
দ্বিতীয়ত, ‘বিভিন্নমুখী’ শক্তি বলতে ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন পদার্থের আকর্ষন বলের কথা বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে,ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন পদার্থজাত আকর্ষন শক্তির বলে গ্রহ নক্ষত্রদের অবস্থান মহাকাশে অবিচ্যুত।
আচ্ছা, একে কি দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের কল্পনামাত্র মনে হচ্ছে? পড়ে যাচাই করে নেয়া যেতেই পারে। কেননা ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’, গ্রন্থটি অতিদুর্লভ বস্তু নয় । গ্রন্থটি পড়লেই বোঝা যাবে কতটা উন্নত ছিল সেই সময়কার গণিত। বইটির প্রথম খণ্ডের নাম লীলাবতি। বইটি এখন আধুনিক গনিতজ্ঞদের গবেষণার বস্তু। এখানে তিনি বহুবার ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস এবং ডিফাররেনশিয়াল ক্যালকুলাসের সুনিপুণ প্রয়োগ করেছেন। তবে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক যে তিনি নন, তাঁর বহু বছর আগের কেউ, সেকথা খুব জোর দিয়েই বলা যায়। কেননা সেই সময় পঞ্চগণিত নামে যে পাঁচ প্রকার গণিত পাঠ্য ছিল তার মধ্যে কলনবিদ্যা (ক্যালকুলাসের প্রাচীন ভারতীয় নাম) ছিল অন্যতম।
মনে হতেই পারে, এটা নিছকই কাকতালীয় যে ক্যালকুলাস প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ভারতে প্রচলিত ছিল। নিউটন পৃথকভাবেই তা আবিষ্কার করেছেন। এই ভ্রান্তি দূর করার জন্য আমি আরো কিছু প্রমাণ দিয়ে বক্তব্যে ইতি টানবো।
মনে আছে, নিউটনের সেই বিখ্যাত উক্তি “আমি যদি সাধারন মানুষের থেকে বেশি কিছু জেনে থাকি, তাহলে তা বিশালাকায়দের কাঁধে ভর দিয়েই” ? সেইরকম বিশালাকায় জ্ঞানী মানুষ পাশ্চাত্যে যে কেউ ছিল না তা তো বলাই বাহুল্য। তবুও তাঁর এই বক্তব্যের অর্থ আমরা তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু ওট্টারবুরি মহাশয়ের লেখা থেকেই বোঝার চেষ্টা করবো। তিনি বলেছেন – “বিনয় আমাদের এই শিক্ষা দেয় প্রাচীন ঋষিদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত থাকতে, বিশেষ করে আমরা যখন তাঁদের কীর্তি সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানি না। নিউটন জানতেন তাঁদেরকে। এবং তাঁদের প্রতিভা, জ্ঞান এবং ক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক অবহিত ছিলেন বলেই তিনি ওইসব প্রাচীন ঋষিদের শ্রদ্ধা করতেন ভগবানের মতো। কারন তাঁদের জ্ঞানের আকর যেসব গ্রন্থ নিউটন সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, সেগুলো অধ্যয়ন করে তিনি এই কথাটাই বুঝেছিলেন যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের আবিষ্কার ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের চেয়ে চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর। প্রাচীন জ্ঞানের আকর গ্রন্থগুলোর সিকিভাগের অর্ধেকও আমাদের কাছে রক্ষিত নেই। থাকলে আমাদের নিত্যনতুন আবিষ্কার সব তাঁদের কাছে ম্লান হয়ে যেত।”

তথ্যসূত্র : Read more of this article »

Posted in Uncategorised

ফেব্রুয়ারী ২২nd, ২০১৫ by ধ্রুব

বর্ণপরিচয় ব্লগ যখন শুরু হয় তখন গুটিকয় লোক। সাইট বানানোর ব্যাপারে কোন অভিজ্ঞতাও নেই। ত সত্ত্বেও সাইট তৈরী হল স্রেফ মনের জোর আর নতুন কিছু করার সংকল্প থেকে। অন্য দেশে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশেও মতপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ব্লগ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গবাসী যেন এব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন। এই পরিস্থিতিকে পাল্টাবার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হল বর্ণপরিচয় ব্লগের।

ধীরে ধীরে সদস্য বাড়ল। হতে থাকল একের পর এক পোস্ট। ব্লগও এগোতে থাকল ধীরে ধীরে। এমন সময়ে এল সেই আঘাত। বন্ধ হয়ে গেল বর্ণপরিচয়! কিন্তু ঐ যে বলেনা ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’, আর ইচ্ছা তো ছিলই সঙ্গে ছিল সংকল্প। সামলাতেই হবে এ ঝড়। আর সামলেও গেল। পুনরায় চালু হল ‘আমাদের সাধের ব্লগ বর্ণপরিচয়’।

অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল সবার প্রতি। বর্ণপরিচয় নিশ্চয় আবার আগের মত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

Posted in Uncategorised

ফেব্রুয়ারী ২১st, ২০১৫ by admin

Welcome to WordPress. This is your first post. Edit or delete it, then start blogging!

Posted in Uncategorised

%d bloggers like this: